বাংলাদেশ

২৫০ প্রজাতির বন্য প্রাণী হত্যা এখন জামিন অযোগ্য অপরাধ

December 6, 2025
4 months ago
By SAJ
২৫০ প্রজাতির বন্য প্রাণী হত্যা এখন জামিন অযোগ্য অপরাধ

এত দিন শুধু বাঘ ও হাতি হত্যার অপরাধে কেউ গ্রেপ্তার হলে জামিন পেতেন না, এখন আরও ২৪৮টি বন্য প্রাণী হত্যার অপরাধও হবে জামিন অযোগ্য।

হুমকির মুখে থাকা দেশের বন্য প্রাণী সুরক্ষার আইনে এই পরিবর্তন আসছে। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদে ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা অধ্যাদেশ’ অনুমোদন পায়।

নতুন আইনে সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে দেশের অধিকাংশ প্রজাতির বন্য প্রাণীকে। এ অধ্যাদেশে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে অনুকূল এমন ১০০ প্রজাতির গাছকেও সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

সন্দেহজনক বন অপরাধীদের পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও পাচ্ছে বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বন্য প্রাণী সুরক্ষা ও কল্যাণে একটি ওয়াল্ডলাইফ ট্রাস্ট গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।

‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২’ এ সংস্কার করে অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশ জারি করতে যাচ্ছে।

এই বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাদেশটি বন্য প্রাণী সংরক্ষণে একটি সুখবর। ইতিমধ্যে অর্থ বিভাগ থেকে নতুন বন্য প্রাণী উইংয়ের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। আগের আইনে বন সংরক্ষণে সরকার ও বন বিভাগের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা ছিল না। নতুন অধ্যাদেশে সেগুলো স্পষ্ট করা হয়েছে।

বন আইনে প্রথাগত বনবাসীর অধিকারকে সংরক্ষণ ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বন অধিদপ্তর বনের সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজ করবে, যাতে বনভূমি নতুন করে বেদখল না হয়।

আগের আইনের মতো অধ্যাদেশে চারটি তফসিল থাকলেও নতুন অধ্যাদেশে তসফিল–১ কে ক, খ, গ এ তিন উপভাগে ভাগ করা হয়েছে। তফসিল–১ (ক) তে পরিবেশের সূচক (ফ্ল্যাগশিপ স্পেসিজ) হিসেবে বাঘ ও হাতিকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তফসিল–১(খ)তে ২৫০ প্রজাতির বন্য প্রাণী সুরক্ষা পাবে।

তফসিল–১(গ) তে ১২৭টি ও তফসিল–২ এ ১ হাজার ২০৭টি প্রজাতির বন্য প্রাণী সুরক্ষার আওতায় এসেছে। তফসিল–৩ আছে ১৫ প্রজাতির ইঁদুর, যেগুলো তাড়াতে পারবে কৃষক। এসব ইঁদুর আইনে সুরক্ষা পাবে না। তফসিল–৪ এ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে ১০০ প্রজাতির গাছকে।

অধ্যাদেশে ১৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭৪১ প্রজাতির পাখি, ১৬০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬০ প্রজাতির উভচর, হাঙর ও শাপলা পাতা ৯১ প্রজাতির, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া, সামুদ্রিক শসা ২৩ প্রজাতির, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাছ, ৩২ প্রজাতির কোরাল, ৩৮ প্রজাতির শামুক ও ঝিনুক, প্রজাপতি ও মথ ১৮৮ প্রজাতির, বিটলস ২৪ প্রজাতির ও ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদকে সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণী মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৫৯৯ প্রজাতি এ অধ্যাদেশে সুরক্ষার আওতায় এসেছে।

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ, প্রাণীবিদ, সংরক্ষণবিদ ও প্রকৃতি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে নিয়োজিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রায় ৭০ জন বিশেষজ্ঞ এ অধ্যাদেশ প্রণয়নে কাজ করেন বলে বন অধিদপ্তর জানিয়েছে।

বন্য প্রাণী হত্যায় যে শাস্তি অধ্যাদেশে

২০১২ সালের আইনের নবম অধ্যায়ের ৩৬ ধারায় বাঘ ও হাতি হত্যাকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জামিন অযোগ্য করা হয়েছিল। এখনো তা–ই আছে। কেউ লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া প্রথমবার বাঘ ও হাতি হত্যা করলে সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার এবং একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ অর্থদণ্ড দেওয়ার আগের বিধান বহাল রাখা হয়েছে নতুন অধ্যাদেশে।

আগের আইনের ধারা–৩৭–এ বলা ছিল, চিতা বাঘ, লাম চিতা, কুমির, ডলফিন, সাম্বার হরিণ, তিমি, ঘড়িয়াল, উল্লুক হত্যা করলে শাস্তি নির্ধারণ আছে সর্বোচ্চ ৩ বছর জেল অথবা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল অথবা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। নতুন অধ্যাদেশেও তা বহাল রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া পারমিট না নিয়ে বাঘ ও হাতির ট্রফি (দেহাংশ) সংরক্ষণ করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আগের আইনের মতোই থাকছে।

তবে আগের আইনের ৪৩ ধারায় বাঘ ও হাতি হত্যাকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করলেও অন্যান্য প্রাণী হত্যাকে আমল অযোগ্য ও জামিনযোগ্য ছিল। নতুন অধ্যাদেশের ৪৬ ধারায় তফসিল–১–এর ক ও খ তে থাকা বন্য প্রাণী হত্যাকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এটাকে জামিনঅযোগ্য করা হয়েছে। ফলে ক তফসিলে থাকা বাঘ, হাতির সঙ্গে এখন ২৫০টি প্রাণী যোগ হচ্ছে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে।

পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা

নতুন অধ্যাদেশের ৩৭ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন বন অপরাধীকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

সে ক্ষেত্রে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, পুলিশের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন উপপরিদর্শক, কাস্টমসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা, কোস্টগার্ডের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পেটি অফিসার, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন হাবিলদার পদমর্যাদার কর্মকর্তা হতে হবে। জামিনযোগ্য ধারায় কেউ অপরাধ করলে তাকে বন অধিদপ্তরের সর্বনিম্ন সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মুচলেকার ভিত্তিতে মুক্তি দিতে পারবেন।

কী বলছেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা

জানতে চাইলে ওয়াল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণের আগের আইনটিতে ঘাটতি ছিল বেশ কিছু। নতুন অধ্যাদেশে সে ঘাটতিগুলোকে দূর করা হয়েছে। ফলে এ অধ্যাদেশটি বন্য প্রাণী সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

জামিন অযোগ্য ধারা নিয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় পাখিসহ অপরাধী ধরা পড়লেও পাখি জব্দের পর আর কিছু করার থাকত না বন কর্মকর্তাদের। কারণ, পাখি ধরা ও হত্যা আমলযোগ্য অপরাধ ছিল না। নতুন আইনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন বন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

আগের আইনে তফসিলভিত্তিক শাস্তি সুনির্দিষ্ট ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন অধ্যাদেশে তফসিলভিত্তিক অপরাধের শাস্তি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া আদার্স ইফেক্টিভ এরিয়া বেইজড কনজারভেশন মেজার্স (অন্যান্য এলাকাভিত্তিক কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা) রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা জোরদার করা যাবে।

অধ্যাদেশটি বেশ কিছু বিষয়কে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখার কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ জামানও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তবে বাস্তবায়নটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ আইন সম্পর্কে বিশদভাবে অবহিত করতে হবে, যাতে তাঁরা আইনটির যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে পারেন। তাহলে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে একটা দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।