৪০০ মিটার সামনেই এভারেস্ট, আর আমি মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ এক খাড়া ঢালে দাঁড়িয়ে আছি
হঠাৎই বাঁ পায়ের ক্র্যাম্পন (পাহাড়ে নিরাপদে চলাচলের জন্য জুতার নিচে বিশেষ ধাতব কাঁটাযুক্ত ডিভাইস) ছিঁড়ে গেল।
তুষারঝড়ে গগলসের ফাঁক দিয়ে বরফ ঢুকে চোখ জ্বালিয়ে দিচ্ছে। প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। হাতে মোটা সামিট গ্লাভস পরা বলে গগলস ঠিকও করতে পারছি না। আর প্রায় ৪০০ মিটার সামনেই এভারেস্ট, আর আমি মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ এক খাড়া ঢালে দাঁড়িয়ে আছি। অল্প সময় পরই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা পূরণ হবে। অথচ সেই মুহূর্তে মনে হলো—সব শেষ।
চিৎকার করে আমার গাইডকে ডাকছি। কিন্তু বাতাসের গর্জনের মধ্যে সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আমাকে এত দূর এনে ফিরিয়ে দেবে এভারেস্ট?
এটাই আমার শেষ সুযোগ। এবারের বসন্তকালীন এভারেস্ট আরোহণ মৌসুম দিন দুয়েকের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই অজানা আশঙ্কায় আমি প্রায় কেঁদে ফেলি।
অথচ ক্যাম্প ২ থেকে আমার এবারের যাত্রাটা ছিল কী দারুণ নির্বিঘ্ন।
২৫ মে সকালে যথাসময়ে ঘুম ভাঙল। ক্যাম্প ৩–এর উদ্দেশে পথ ধরব। আমার ব্যাগে তেমন কিছু নেই, বেশির ভাগ জিনিসই ক্যাম্প ৩-এ রেখে এসেছি। আছে শুধু কিছু শুকনা খাবার আর অক্সিজেন সিলিন্ডার। তৈরি হয়ে ডাইনিং তাঁবুতে এসে কোনোমতে নাশতা সেরে নিলাম। ভারতের অঞ্জনা যাদব ও ভিনেই, ইথিওপিয়ার ইয়োনাস—সবাইকেই বেশ উজ্জীবিত লাগছে। সবার চোখেমুখে আসন্ন সামিটের আনন্দ। গাইডরা এসে বের হওয়ার জন্য তাড়া দিল। অন্য সময় দেশে থাকা এভারেস্টজয়ী (ইকরামুল হাসান) শাকিল ভাইকে নিয়মিত আপডেট জানাই। এবার সেই দায়িত্ব ক্যাম্প ২ ম্যানেজার অ্যাং তেম্বা শেরপাকে দিয়ে আমি নির্ভার হাঁটা শুরু করি।
আজ আমার গতি বেশ ভালো। শরীর ও মন—দুটোই সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। পথে অঞ্জনাকে পেছনে ফেলে চলে এলাম। গাইড মিলান জানাল, এই গতিতে চলতে থাকলে সামিট নিশ্চিত।
ক্যাম্প ২ থেকে ক্যাম্প ৩-এর পথের প্রথম অংশ একদম সোজা। তেমন কোনো চড়াই-উতরাই নেই, শুধু হেঁটে যাওয়া। ক্র্যাম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগল। এরপর শুধু ওপরে ওঠা। বিশ্রাম নেওয়ার মতো জায়গাও নেই। তাই সেখানেই একটু পানি ও চকলেট খেয়ে নিলাম। আরেক গাইড দাওয়া ক্র্যাম্পন পরে নিল।
শুরুতেই প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া চড়াই। দড়িতে জুমার (হ্যান্ডলযুক্ত ক্লাম্প, যা দড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে দেয় কিন্তু পিছলে নিচে পড়তে দেয় না) লাগিয়ে আমি প্রস্তুত। আগে একবার এসেছি বলে এগুলো এখন অনেক সহজ মনে হয়। বরফের দেয়ালে লাগানো মই বেয়ে এবং কঠিন বরফে ক্র্যাম্পন ও জুমারের সাহায্যে সহজেই এই অংশ পার হয়ে ওপরে উঠে গেলাম।
এখন টানা তিন-চার ঘণ্টা বরফের দেয়ালে জুমার চালিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ৬ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতা থেকে ৭ হাজার ৭০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প ৩-এ পৌঁছাতে হবে।
একটার পর একটা রোপ পেরিয়ে যাচ্ছি। এবার এভারেস্টে পর্বতারোহীদের বেশ জটলা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই শেষ পর্যায়ে ক্লাইম্বার কম থাকায় আমাদের কোথাও অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। চার ঘণ্টার মধ্যে আমি ও আমার শেরপা ক্যাম্প ৩-এ পৌঁছে গেলাম।
একটি খাড়া ঢালের ওপর ক্যাম্প ৩। ঠিকমতো দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। সরাসরি তাঁবুতে ঢুকে পড়ি। গাইড লাকপা চা ও বিস্কুট নিয়ে এল। এখানে কোনো ডাইনিং তাঁবু নেই। ছোট্ট গ্যাসের চুলায় সামান্য চা, গরম পানি বা স্যুপ তৈরি করা হয়। শুকনা খাবারই ভরসা।
বেলা একটার দিকে অঞ্জনা, ইয়োনাস ও ভিনেইও চলে এল। অঞ্জনা আর আমি একই তাঁবুর বাসিন্দা। দুপুরে আমাদের ভেজিটেবল স্যুপ দেওয়া হলো। এরই মধ্যে শুরু হলো প্রচণ্ড তুষারপাত।
আবহাওয়া ভালো থাকবে জেনেই আমরা এসেছি। তুষারপাত দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। তুষারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল ক্ষুধা। সামান্য ভেজিটেবল স্যুপে কাজ হলো না। আমরা চিৎকার করে গাইডদের ডাকতে থাকি। এই দুর্যোগে কেউ শুনতে পেল না। অনেকক্ষণ পরে লাকপা আমাদের ডাক শুনে এল। আমরা খাবার চাইলাম। সে দুটি নুডলস স্যুপ বানিয়ে দিতে রাজি হলো।
আমরা নিজেদের কাছে থাকা শুকনা খাবার খেতে থাকি। ক্যাম্প ৩-এ আমরা সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ব্যবহার করছি। শুধু খাওয়ার সময় অক্সিজেন মাস্ক খুলে খাবার খাই। তাঁবুর পেছনের জানালা দিয়ে অন্য তাঁবুতে থাকা ইয়োনাস–ভিনেইয়ের সঙ্গে কথা বলি। ওদের বেশ ক্লান্ত দেখায়, কিন্তু আমি ও অঞ্জনা উত্তেজনায় টগবগ করছি। বারবার একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছি—আমরা পারব।
কিছুক্ষণ পর গাইড মিলান এসে জানাল, ভোর চারটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নাশতা সেরে ক্যাম্প ৪-এর উদ্দেশে রওনা দিতে হবে।
বিকেল পাঁচটার দিকে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। রাতের খাবার বলতে ক্যাম্প ২ থেকে নিয়ে আসা ফ্রায়েড রাইস। এই খাবার খাওয়া ছিল ভীষণ কষ্টকর। তারপরও জুস আর পানি দিয়ে গিলে নিচ্ছি; কারণ, এই খাবারই ক্যাম্প ৪-এর পথে আমাকে শক্তি জোগাবে।
সকালে বের হতে হতে সাড়ে ছয়টা বেজে গেল। অঞ্জনা ও মিলান আগেই বেরিয়ে গেছে। ভিনেইয়ের বুকে ব্যথা হওয়ায় সে গাইডসহ নিচে নেমে গেছে। আমার গাইডের তৈরি হতে একটু সময় লাগল। তাই বের হতে দেরি হলো।
ক্যাম্প ৩ থেকে ক্যাম্প ৪ পর্যন্ত পুরো পথই খাড়া চড়াই। ক্যাম্প থেকে বের হয়েই দড়িতে জুমার লাগাই। আমার ভেতরে তীব্র উত্তেজনা। বাইরে ভয়ংকর তুষারঝড়। তার মধ্যেই আমরা এগিয়ে চলেছি। যত দূর জেনেছি, আজ আবহাওয়া এমনই থাকবে, সন্ধ্যার দিকে উন্নতি হবে।
দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে রোপে ঝুলেই পানি খাচ্ছি, চকলেট খাচ্ছি। সামনে থাকা অঞ্জনাকে পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। একটার পর একটা বিশাল বরফের দেয়াল অতিক্রম করে আর আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে ক্যাম্প ৪-এ পৌঁছাই।
আট হাজার মিটার উচ্চতায়, প্রায় সমতল জায়গায়, ডেথ জোনে এই ক্যাম্প ৪। দুই দিন ধরে এখানে আবহাওয়া খারাপ। তীব্র বাতাসে তাঁবুগুলো ছিঁড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ক্যাম্পজুড়ে ঝড়ের তাণ্ডবের চিহ্ন। ছেঁড়া তাঁবু, ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডার, চুলা, খাবার—সবকিছু এলোমেলো পড়ে আছে। সব মিলিয়ে ক্যাম্প ৪ যেন ময়লার বিশাল এক স্তূপ।
আমার গাইড কোনোমতে একটি তাঁবু ঠিক করে আমাকে বসার ব্যবস্থা করল। তাকে জিজ্ঞেস করি, ক্যাম্প ৪ পরিষ্কার করা হয় না? উত্তর শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। ক্যাম্প ৪ নাকি প্রায় সব সময়ই এমন ময়লা থাকে, নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না।
ইতিমধ্যে অঞ্জনা ও অন্য শেরপারাও এসে পৌঁছেছে। তাঁবুর ভেতরেও আমাদের বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে; কারণ, তাঁবুর বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেছে।
কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আমরা ফাইনাল সামিট পুশের প্রস্তুতি নিলাম। সামিট স্যুটের পকেটে বিভিন্ন ধরনের চকলেট ভরে নিই। গরম পানির বোতল বুকের কাছে স্যুটের ভেতরের পকেটে রাখি। না হলে পানি বরফ হয়ে যাবে। এই গরম পানির বোতল আবার শরীরও গরম রাখবে।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আমরা ক্যাম্প ৪ থেকে রওনা দিই। আমরাই প্রথম দল হিসেবে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়েছি। বাতাস থেমে গেছে। আবহাওয়া পরিষ্কার। অদ্ভুত সুন্দর সূর্যাস্ত মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমি, অঞ্জনা এবং আমাদের সঙ্গে পাঁচজন গাইড এগিয়ে চলেছি। আমাদের এজেন্সি অতিরিক্ত গাইড দিয়েছে, যেন কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সহায়তা নেওয়া যায়।
চলতে চলতে একসময় ব্যালকনিতে পৌঁছাই। সেখানে আমার গাইড অক্সিজেন সিলিন্ডার বদলে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আরও অনেক ক্লাইম্বার সেখানে চলে আসে। তবে অন্য দিনের মতো কোনো জটলা নেই।
ব্যালকনিতে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল বাতাস ও তুষারঝড় শুরু হয়ে যায়। আমার গগলস একটু ঢিলা করে বাঁধা ছিল। তুষারের কণা চোখে ঢুকে গেল। এর মধ্যেই ক্র্যাম্পন ছিঁড়ে পড়ি সেই বিপত্তিতে। চিৎকার করে আমার গাইড দাওয়াকে ডাকতে থাকি। সে শুনতে পেল না। পেছন থেকে লাকপা শুনে তাকে জানাল যে আমার ক্র্যাম্পন ছিঁড়ে গেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে দাওয়া চলে এল। একটি দড়ি কেটে এনে ক্র্যাম্পন বেঁধে দিল। সাবধানে পাথরের ওপর পা ফেলতে বলল। লাকপাও চলে এসেছে। সে তার স্নো গগলস আমাকে দিল। এরপর যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম।
আবার এগিয়ে চলি। একটার পর একটা বরফের দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছি। ঢাকার প্রিয় মুখগুলোর কথা মনে পড়ছে। সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে আমার সামিটের অপেক্ষায় আছে। শাকিল ভাই, শম্পা আপু, শাম্মি, তামান্না, তমা, বন্ধু শম্পা—অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
একসময় হিলারি স্টেপে পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে শিখর মোটে ৬০ মিটার। ইতিমধ্যে আবহাওয়া পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে। পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে আছে। ধীরে ধীরে নতুন দিনের সূর্য উঠল। এমন সুন্দর সূর্যোদয় আগে কখনো দেখিনি।
সূর্যোদয় দেখতে দেখতে সামিটের কাছে পৌঁছে যাই। কতশত দিনের পরিশ্রম, অপেক্ষা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ফল।
আমি চূড়া ছুঁয়ে দেখি। আমি পেরেছি, আমার স্বপ্নকে ছুঁতে পেরেছি।