আবার কি ফিরবে প্রাপ্তবয়স্ক থ্রিলারের যুগ
একসময় হলিউড মানেই ছিল শুধু অ্যাকশন, রোমান্টিক কমেডি বা পারিবারিক বিনোদন নয়, এর পাশাপাশি দাপটের সঙ্গে টিকে ছিল একটি প্রাপ্তবয়স্ক, সাহসী ও বিতর্কিত ঘরানা—ইরোটিক থ্রিলার। যেখানে যৌনতা, রহস্য, অপরাধ, ক্ষমতার রাজনীতি আর মানসিক টানাপোড়েন একসঙ্গে মিশে তৈরি করত উত্তেজনাপূর্ণ গল্প। নব্বইয়ের দশকে এই ঘরানার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘরানা যেন ধীরে ধীরে মূলধারা থেকে হারিয়েই গেল। সম্প্রতি ‘দ্য হাউসমেইড’ সিনেমার ব্যাপক সাফল্যে অনেকেই মনে করছেন, হলিউডের আবারও বাড়ছে এই ঘরানার সিনেমা।
সাহসী গল্পের যুগের শুরু আশির দশকের শেষ দিকে এবং নব্বইয়ের শুরুতে হলিউডে এমন একটি সময় আসে, যখন দর্শকেরা শুধু নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনি নয়; বরং সম্পর্কের অন্ধকার দিক, নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা ও বিপজ্জনক সম্পর্ক দেখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই চাহিদা থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইরোটিক থ্রিলার।
এ ঘরানার ছবিতে যৌনতা কখনো শুধু রোমান্স নয়; বরং গল্পের মূল চালিকাশক্তি। এখানে আকর্ষণ যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়, প্রতারণা, খুন, মানসিক খেলা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। দর্শকের কাছে এই মিশ্রণ ছিল নতুন, ঝাঁজালো ও আলোচনাযোগ্য।
‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’ এবং বিস্ফোরণনব্বইয়ের দশকের শুরুতে একটি ছবি যেন পুরো ঘরানাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’। শ্যারন স্টোন ও মাইকেল ডগলাস অভিনীত এই ছবি শুধু বক্স অফিসে সফলই হয়নি, এটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সাহসী দৃশ্য, রহস্যময় নারী চরিত্র এবং পুলিশের তদন্তের সঙ্গে যৌন রাজনীতির মিশ্রণ—সব মিলিয়ে ছবিটি একধরনের মানদণ্ড তৈরি করে দেয়।
এর পরপরই একের পর এক ইরোটিক থ্রিলার আসতে থাকে। দর্শকেরা দেখতে পান সম্পর্কের জটিলতা, অবিশ্বাস, পরকীয়া এবং সেই সব সিদ্ধান্তের ভয়ংকর পরিণতি।
জনপ্রিয় ছবির তালিকাএ ঘরানার স্বর্ণযুগে কিছু ছবি হয়ে ওঠে আইকনিক। এগুলোর মধ্যে আছে ‘ফ্যাটাল অ্যাট্রাকশন’; এক বিবাহিত পুরুষের এক রাতের সম্পর্ক কীভাবে ভয়াবহ পরিণতিতে রূপ নেয়, তারই গল্প। ‘বডি হিট’, যৌনতা, লোভ আর খুনের ষড়যন্ত্রের মিশ্রণে তৈরি এক ক্ল্যাসিক থ্রিলার। আরও আছে ‘সিঙ্গেল হোয়াইট ফিমেল’; বন্ধুত্বের আড়ালে পরিচয় চুরি আর মানসিক বিপর্যয়ের গল্প। ‘আনফেইথফুল’; দাম্পত্য জীবনের বাইরে সম্পর্ক এবং তার ভয়াবহ মূল্য।
এসব ছবিতে বড় তারকারা কাজ করতেন। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক গল্প হয়েও এগুলো ছিল মূলধারার বিনোদনের অংশ।
সমাজ, নৈতিকতা ও বিতর্কইরোটিক থ্রিলার মানেই ছিল বিতর্ক। যৌনতা, নারীর উপস্থাপন, সহিংসতা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠত। অনেক সময় এসব ছবির বিরুদ্ধে নৈতিকতার দোহাই দিয়ে সমালোচনা হতো। অন্যদিকে অনেকে বলতেন, এই ঘরানার ছবিগুলো আসলে সম্পর্কের অন্ধকার দিক, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানসিক জটিলতাকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরে।
একই সঙ্গে তখনকার আমেরিকান সমাজে রক্ষণশীলতার ঢেউ, এইডস আতঙ্ক এবং মিডিয়ার চাপ—সব মিলিয়ে স্টুডিওগুলোর ওপর বাড়তি নজরদারি ছিল। রেটিং বোর্ডের কড়াকড়িও অনেক সময় নির্মাতাদের সীমাবদ্ধ করত।
নতুন শতাব্দীতে পরিবর্তনদুই হাজার সালের পর হলিউডের চেহারা বদলে যেতে শুরু করে। বড় স্টুডিওগুলো ঝুঁকে পড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ও সুপারহিরো-নির্ভর ছবির দিকে। পরিবারসহ দেখার মতো বড় বাজেটের ছবি তখন স্টুডিওগুলোর প্রধান ভরসা। হ্যারি পটার, লর্ড অব দ্য রিংস, মার্ভেল ইউনিভার্স—এসব বড় প্রকল্পের ভিড়ে ইরোটিক থ্রিলারের জায়গা সংকুচিত হতে থাকে।
একই সঙ্গে ইন্টারনেট ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট পাওয়া সহজ হয়ে যায়। ফলে সিনেমা হলে গিয়ে এমন ধরনের ছবি দেখার প্রয়োজনীয়তা অনেক দর্শকের কাছেই কমে যায়।
তারকা ও বাজারের বাস্তবতাএকসময় যেসব বড় তারকা এই ঘরানার ছবিতে নিয়মিত কাজ করতেন, তাঁদের অনেকেই বয়স ও ক্যারিয়ারের পরিবর্তনের কারণে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে ঝুঁকে পড়েন। নতুন প্রজন্মের তারকারা তুলনামূলক নিরাপদ, ব্র্যান্ড-ফ্রেন্ডলি ছবিতে কাজ করতে আগ্রহী হন। ফলে ইরোটিক থ্রিলার ধীরে ধীরে হয়ে পড়ে ছোট বাজেটের, কম আলোচিত একটি ঘরানা।
স্ট্রিমিং যুগ ও আংশিক প্রত্যাবর্তনতবে একেবারে হারিয়ে যায়নি এই ঘরানা। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে কিছু সিরিজ ও ছবি আবার সম্পর্কের অন্ধকার দিক, ক্ষমতা ও যৌন রাজনীতিকে থ্রিলারের মোড়কে তুলে ধরছে। তবে সেগুলো আগের মতো বড় স্টুডিও-সমর্থিত, তারকাবহুল সিনেমা নয়; বরং ছোট পরিসরে, নির্দিষ্ট দর্শকের জন্য তৈরি কনটেন্ট।
#মি টু আন্দোলন ও নতুন সংবেদনশীলতাসাম্প্রতিক সময়ে যৌনতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ফলে নির্মাতারা এখন আরও সতর্ক। কীভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সম্মতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য দেখানো হচ্ছে—এসব বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীলতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ইরোটিক থ্রিলারের পুরোনো ধাঁচ অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে।
কেন এখনো আকর্ষণীয়তবু ইরোটিক থ্রিলারের প্রতি নস্টালজিয়া রয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকের দর্শকদের কাছে এই ছবিগুলো মানেই ছিল সাহসী গল্প, বড় তারকার উপস্থিতি আর উত্তেজনাপূর্ণ থ্রিল। আজও যখন সেই ছবিগুলোর কথা ওঠে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা—কেন আজ এমন ছবি আর হয় না, কেন সম্পর্কের জটিলতা এভাবে বড় পর্দায় দেখা যায় না।
এবং ‘দ্য হাউসমেইড’গত বছরের শেষের ছুটির মৌসুম শুরু হওয়ার সময় হলিউডে খুব কম মানুষই পরিচালক পল ফিগের ‘দ্য হাউসমেইড’ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন; বরং আলোচনায় ছিল সিনেমাটির তারকা সিডনি সুইনিকে ঘিরে আমেরিকান ইগল জিনসের একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া বিতর্ক। ফ্রেইডা ম্যাকফ্যাডেনের একই নামের বেস্টসেলার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে সুইনির সঙ্গে অভিনয় করেছেন আমান্ডা সেফ্রিড ও ব্র্যান্ডন স্কলেনার। এখন অবশ্য পরিস্থিতি বদলে গেছে। ২৩ থেকে ২৫ জানুয়ারির সপ্তাহান্তে ‘দ্য হাউজমেইড’ বিশ্বজুড়ে টিকিট বিক্রি থেকে আয় করেছে ২৯৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। এতে এটি পল ফিগের ক্যারিয়ারের আগের রেকর্ডধারী ‘ব্রাইডসমেইডস’–কে (২৮৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ছাড়াই এটি ফিগের পরিচালিত সিনেমাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ আয়।
এই সাফল্য সিডনি সুইনির ক্যারিয়ারেও নতুন মাইলফলক। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে এটিই তাঁর সবচেয়ে বেশি আয় করা ছবি, যা সহজেই ছাড়িয়ে গেছে ‘এনিওয়ান বাট ইউ’-কে (২০৮ মিলিয়ন ডলার)। শুধু তা–ই নয়, ২০২৫ সালের বহু আলোচিত সিনেমা—এমনকি অস্কারের সম্ভাব্য প্রতিযোগী ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’-এর চেয়েও বেশি আয় করেছে ছবিটি। সবকিছুই ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন মহামারির পরও বিশ্ব বক্স অফিস এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
বক্স অফিস বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘দ্য হাউসমেইড’ সিনেমার এই ব্যাপক সাফল্যে হলিউডে আবারও ফেরাতে পারে ইরোটিক থ্রিলারের যুগ।
দ্য রিঙ্গার অবলম্বনে