বাংলাদেশ

আগাছা মারতে প্যারাকোয়াট, মরছে মানুষ: ৭০ দেশে নিষিদ্ধ, বাংলাদেশে চলছে কীভাবে

August 15, 2026
6 days ago
By SAJ
আগাছা মারতে প্যারাকোয়াট, মরছে মানুষ: ৭০ দেশে নিষিদ্ধ, বাংলাদেশে চলছে কীভাবে

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গত জুলাইয়ে ১১৭ জন রোগী বিষক্রিয়া নিয়ে ভর্তি হন। এ জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা বরাবরই বেশি। তবে ইদানীং আগাছানাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টার প্রবণতা বেড়েছে। জুলাইয়ে ১১৭ জন রোগীর মধ্যে বেশির ভাগ আগাছানাশক পান করেছিলেন বলে জানায় হাসপাতাল সূত্র।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিকাজে আগাছানাশক হিসেবে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ‘প্যারাকোয়াট’ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য নিয়ে করা ওই গবেষণা বলছে, ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ায় একটি মৃত্যুর ঘটনার রেকর্ড পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে একই রাসায়নিক পানে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ২১২। দেশে আত্মহত্যার উপকরণ হিসেবে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এটা পান করলে ধুঁকে ধুঁকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয়।

আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন সাময়িকীতে গত মে মাসে ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশে প্যারাকোয়াটের আমদানি ও ব্যবহার যেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে যেখানে দেশে ৫৩ টনের বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে। কৃষি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে দিনমজুরের সংকট এবং পারিশ্রমিক বৃদ্ধির কারণে কৃষকেরা হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করার বদলে এই রাসায়নিকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। অথচ ইতিমধ্যে বিশ্বের ৭৭টি দেশে বিষাক্ত এই রাসায়নিক নিষিদ্ধ।

গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে ১২ বছরে ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা পেয়েছেন গবেষকেরা।

ওই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকেরা অংশ নেন। গবেষকেরা দাবি করেছেন, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া নিয়ে এটি এ দেশের সবচেয়ে বড় গবেষণা।

গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব হাসপাতাল দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা দেয়। গবেষণায় প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ার মোট ১ হাজার ৪২০টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিলিটার প্যারাকোয়াট পানের ফলে ফুসফুস ধীরে ধীরে অকেজো (পালমোনারি ফাইব্রোসিস) হয়ে যায় এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে ধুঁকে ধুঁকে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। রোগীদের প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র কিডনি বৈকল্য (যার কারণে পা ফুলে যায়), ঘন ঘন বমি ও পেটের ব্যথা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ সালে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ার একটি মৃত্যু ঘটনা জানা যায়। কিন্তু ২০২৪ সালে এই রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার ৪৯৩ ঘটনার রেকর্ড পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষণা উঠে এসেছে। গবেষকেরা এই প্রবণতাকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বিষবৈজ্ঞানিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এ বিষয়ে টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের (টিএসবি) সভাপতি এবং গবেষণার অন্যতম লেখক অধ্যাপক মো. আবুল ফয়েজ প্রথম আলোকে বলেন, এই গবেষণায় প্যারাকোয়াটের মারাত্মক ক্ষতি প্রমাণিত হয়েছে। এটি নিষিদ্ধ করা জরুরি। এত দিন কেন এই মারাত্মক ক্ষতিকারক কীটনাশক দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। সরকারের জরুরি বিবেচনা করা দরকার।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় অংশই তরুণ, যাঁদের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে (৭৮ দশমিক ২ শতাংশ)। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী (৩৮ দশমিক ১ শতাংশ) ও গৃহিণী (২৪ দশমিক ৫ শতাংশ)। কৃষকদের আক্রান্ত হওয়ার হার ১৪ শতাংশ।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, শুধু প্যারাকোয়াট নয়, এ ধরনের বিষাক্ত ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতির মাত্রা নিরূপণের জন্য পেশাজীবী ও গবেষকদের একটি কমিটি করা হয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে। এরপর ওই প্রতিবেদনকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা হবে। যদি সত্যিই খুব ক্ষতিকর প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন নিষিদ্ধের বিষয়টি আসবে।

জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকির কারণে বিশ্বের ৭৭টির বেশি দেশে প্যারাকোয়াট বর্তমানে নিষিদ্ধ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার না করলেও তেলেঙ্গানাসহ একাধিক রাজ্য সরকার এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত ইউরোপে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধের নির্দেশ দেয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র প্রতিবাদের মুখে অস্ট্রেলিয়ায় প্যারাকোয়াট পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করলেও ব্যবহারের নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। দেশটির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গবেষণায় দেখা গেছে প্যারাকোয়াটের সংস্পর্শে এলে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়।

বিষক্রিয়ার ভয়াবহতা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, ‘প্যারাকোয়াট ব্যবহারের সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের পারকিনসন্স ডিজিজ ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে যেখানে ৬৫ শতাংশ মানুষই জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।’

গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০০০ সালে ‘ডব্লিউএইচও ক্লাস-১’ভুক্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশকগুলো নিষিদ্ধ করেছিল, যা দেশে আত্মহত্যার হার কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কৃষকসহ জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এতে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনি।

ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, প্যারাকোয়াটের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক নেই। বর্তমানে পাকস্থলী পরিষ্কার করা, স্টেরয়েড, সাইক্লোফসফামাইড, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, হেমোডায়ালাইসিস বা হেমোপারফিউশনের মতো চিকিৎসা দেওয়া হলেও কোনোটির কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। এ কারণেই মৃত্যুর হার এত বেশি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী বিএমসি পাবলিক হেলথ–এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার পর আত্মহত্যার হার কমে গেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার জন্য বিষপানের ক্ষেত্রে প্যারাকোয়াট ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপাদান। ২০০৬ সালে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার পর ২০১০ সালে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার প্রতি ১ লাখে ৫ দশমিক ২৬ থেকে কমে ২ দশমিক ৬৭-এ নেমে আসে—অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক।

দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গোপাল দাশের নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেশে নিবন্ধিত ২৫টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক চিহ্নিত করা হয়। ২০২৫ সালে গবেষণাটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত আটটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত ৩৪৩টি সক্রিয় কীটনাশক উপাদান বিশ্লেষণ করে পাওয়া ২৫টি উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশক পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১১টি কীটনাশক, ৭টি ছত্রাকনাশক, ৫টি আগাছানাশক ও ২টি ইঁদুরনাশক। গোপাল দাশ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যে ২৫টি উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশক পেয়েছি, তার মধ্যে যদি কোনোটিকে নিষিদ্ধ করতে হয়, তবে প্রথমেই প্যারাকোয়াটকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’

একসময় কেবল চা–বাগানের আগাছানাশকের জন্য আমদানি করা হতো প্যারাকোয়াট। কালক্রমে তা দেশের সব কৃষিক্ষেত্রে এখন ব্যবহার বা বলা যায় বিপুল পরিমাণে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার দুর্গম এলাকা সীমানাছড়ির জুমখেতে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে জুমচাষি বনেরঞ্জন ত্রিপুরার সঙ্গে কথা হয়। এ চাষের হাল নিয়ে তিনি বলছিলেন, এখন জুমে কীটনাশক ব্যবহার হয়। বিশেষ করে আগাছানাশক। এর মধ্যে প্যারাকোয়াটও আছে। বনেরঞ্জন এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কিছু জানেন না, তবে এটি দ্রুত আগাছা পরিষ্কার করে, তা তিনি নিশ্চিত।

চা–বাগান থেকে সমতল অঞ্চলের কৃষি, এমনকি দুর্গম পাহাড়ের জুমখেত—প্যারাকোয়াট সর্বত্র।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রমিজ উদ্দিন প্যারাকোয়াট নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্যারাকোয়াটের চরম অপব্যবহার হচ্ছে এটা আমরা দেখেছি। আর কোম্পানিগুলোও ইচ্ছামতো আমদানি করছে। এর যে বিকল্প নেই, তা কিন্তু নয়। বর্তমানে ইন্টিগ্রেটেড উইড ম্যানেজমেন্ট, যান্ত্রিক আগাছা দমন এবং ইমাজাপাইর, কারফেনট্রাজোন-ইথাইল ও ডিকাম্বার মতো তুলনামূলক কম বিষাক্ত আগাছানাশক ব্যবহার করা সম্ভব।’