আলোর ভেতরে মানুষ: মতিউর রহমানের নীরব শক্তি ও জীবনের পাঠ
দেখুন, খেলার মাঠ, বাম রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ি। ’৬৫ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত আমি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলাম। ’৬৫ থেকে ’৬৮ পর্যন্ত ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক। এগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যাঁরা সেরা কবি, সেরা লেখক, সেরা প্রবন্ধকার, সেরা শিল্পী ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
শিল্পী কামরুল হাসান, কবি শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী নিতুন কুন্ডু, শিল্পী রফিকুন্নবী প্রমুখ। আমার স্কুলের তিনজন ড্রয়িং টিচার ছিলেন সে সময়ের সেরা শিল্পী। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর ও কাজী আব্দুল বাসেত। আবার সে সময় সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব ছিল।
১৯৫৮ সাল থেকে আমি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হই এবং ১৯৬০ সালে ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলি। ’৬৪ সালে আমি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের ক্যাপ্টেন। সব মিলিয়ে খেলার মাঠ, ফুটবল, ক্রিকেট, ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, সংস্কৃতি সংসদ, সভা, মিছিল, সংকলন, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবই ছিল।
১৯৬৪ থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বা এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোয় ছাত্র ইউনিয়ন সবচেয়ে ভালো করত। এ ক্ষেত্রেও আমার একটা ভালো ভূমিকা থাকত সব সময়। আবার প্রধান সাহিত্যিক-শিল্পীদের পাশাপাশি সেরা অভিনেতা আবুল হায়াত, আতাউর রহমান, গোলাম রাব্বানী, কাজী তামান্না—তাঁরা সবাই আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আমাদের সব অনুষ্ঠানে দেশের গান হতো। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, জাহেদুর রহিম, অজিত রায় প্রমুখ।
১৯৬৫ সালে আমরা তাসের দেশ করলাম। প্রথম পরিচালনা করলেন বিখ্যাত অভিনেতা মাসুদ আলী খান। তারপর আরেকবার করলেন হাসান ইমাম। আবার রক্তকরবী করলাম বিপুল সফলতার সঙ্গে। রাজা হয়েছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তাফা। নন্দিনী হয়েছিলেন কাজী তামান্না। পরিচালনা করেছেন হাসান ইমাম। মঞ্চ তৈরি করেছিলেন ইমদাদ হোসেন। কার্ড ও অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী।
আমি বলব যে ষাটের দশক বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য একটা শ্রেষ্ঠ সময়। সে সময়ের সৃষ্টি সবই সেরা—সেরা ব্যক্তি, সেরা মানুষ, সেরা কাজ। এটা শুরু পঞ্চাশের দশকে, কিন্তু এর একটা বড় জায়গা তৈরি হলো ষাটের দশকে। যেখান থেকে ’৬৯-’৭০-এর পরে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে গেলাম।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্রিকা বন্ধ ছিল। বাকশাল হওয়ার পরেও আবার বন্ধ হয়ে গেল। জিয়াউর রহমানের সময় নতুন করে অনুমতি পেলাম। এরশাদ একবার বন্ধ করে দিলেন। এভাবেই চলেছে। এর মধ্যে আমি রাজনীতির কাজ করেছি, সংগঠনের কাজ করেছি, অন্যান্য কাজ করেছি—তবে পত্রিকার কাজও নিয়মিতভাবে করেছি।
দেশের রাজনীতির উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ’৮৮ সালে ঠিক করি যে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। কারণ, তখন আমার চোখের সামনে আমাদের স্বপ্নের আদর্শভিত্তিক যে রাষ্ট্র—সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সর্বশেষ আমি মস্কো যাই ১৯৮৮ সালে। তখন বুঝতে পারছিলাম যে এই ব্যবস্থা থাকছে না।
নিজেকে আরেকটু প্রসারিত করা, বড় করে সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য থেকে ১৯৮৮ সালে আমি দৈনিক সংবাদ-এ নিয়মিত কলাম লিখি। সংবাদ-এ আমি সংবাদ লিখেছি, সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আরও একাধিক দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজে নানাভাবে লেখালেখি করেছি। ঢাকা কুরিয়ার-এ রিপোর্ট করেছি, লিখেছি। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ-এ কলাম লিখেছি। মূলধারা নামে একটা সাপ্তাহিক কাগজ ছিল—শামসুর রাহমান সম্পাদক, সেখানে আমি বড় বড় সাক্ষাৎকার নিতাম। বন্ধু বেনজীর আহমদ ছিলেন নির্বাহী প্রধান। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমি বেশ কিছুদিন নতুন দৈনিক আজকের কাগজ-এ বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ রিপোর্ট ও কলাম লিখেছি। আরও কিছু কাগজে লিখেছি। আমি কেবল কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকার সম্পাদক না—আমি একজন সাংবাদিক, এটা প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত কাজগুলো করেছি।
ওই অবস্থায় ১৯৯১ সালে আমি কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে নির্বাচনের প্রার্থিতা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিই। আমি কিন্তু কখনো কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করিনি বা আমাকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করে চলে যেতে বলেনি কেউ। সে জন্য আমি বলি, ‘মাই ফার্স্ট পার্টি অ্যান্ড লাস্ট পার্টি ইজ সিপিবি’। ’৯১ সালে এই কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে দূরে সরে আসি। একতার দায়িত্ব থেকে সরে যাই।
তারপর আজকের কাগজ-এর কয়েকজন তরুণ বন্ধুর সহযোগিতায় ভোরের কাগজ করি। শুরুতে আমি প্রকাশক এবং সম্পাদক—১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। পরে প্রকাশক বদল হয়। তখন বিএনপির আমল। রাজনীতিতে নানা অস্থিরতা ছিল। এর মধ্যে কাগজ করে গেলাম।
একসময় বিএনপি সরকার আমাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। তারপর আমাদের যিনি প্রকাশক ছিলেন, তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ’৯৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে উপমন্ত্রী হয়ে গেলেন। তখন আমাদের স্বাধীন সাংবাদিকতার জায়গাটা সংকুচিত হয়ে গেল, বাধা পড়তে শুরু করল। রাত্রিবেলা কাগজ ঠিক করে দিয়ে আসি, সকালে দেখি কাগজটা একটু অন্য রকম হয়ে গেছে। কিছুদিন দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি ভোরের কাগজ ছেড়ে দেব। তখন ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক আমার বন্ধু মাহফুজ আনাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকে যাঁর সঙ্গে পরিচয়—তিনি উদ্যোগ নিলেন যে আমরা একটা বাংলা কাগজ করব।
তখন তিনি আমাকে জনাব লতিফুর রহমানের কাছে নিয়ে গেলেন। আমরা তিনজন মিলে পরামর্শ করে প্রথম আলো সংগঠিত করলাম। লতিফুর রহমান সাহেব খুবই প্রাজ্ঞ ও সচেতন একজন নাগরিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আমরা যেমন ভেবেছিলাম যে একটা স্বাধীন-নিরপেক্ষ সংবাদপত্র করব—তিনি এর প্রবল সমর্থক ছিলেন। সময়টা এমন ছিল যে তখন সবকিছু ভাগ হয়ে যাচ্ছে, বিভক্ত হয়েছে—সংবাদপত্রসহ সব। তখন বেসরকারি টেলিভিশন ছিল না। তিনি বললেন, মানুষ একটা নিরপেক্ষ সংবাদপত্র চায়। এর চার বছরের মধ্যে আমরা দেশের এক নম্বর কাগজ হয়ে যাই।
এই দলনিরপেক্ষ, স্বাধীন সাংবাদিকতাই আমাদের বাঁচিয়ে দিল, টিকে থাকলাম। তারপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল, তারাও সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিল। আবার বিএনপি সরকার এল, একই কাজ করল।
তবে এটাও বলতে পারেন যে আমাদের শক্তি, সামর্থ্য, অবস্থানের জন্য ধীরে ধীরে নানা কারণে, নানাভাবে এই বৃহৎ কোম্পানিগুলো আমাদের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করল। কারণ, তাদের ব্যবসা প্রসার, প্রচার ইত্যাদির জন্য লাগবে। তারা কেউ কেউ গিয়ে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে অনুমতি নিয়ে এল। কেউ এল না, কেউ সহ্য করে ধীরে ধীরে অন্যভাবে, নানাভাবে আসা শুরু করল।
বিগত সরকারের পতন হলো ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। এর আগে পর্যন্ত গ্রামীণফোন আমাদের ১২ বছর বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি। একই অবস্থা হয়েছে ইউনিলিভারের সঙ্গে, আরও কোম্পানির সঙ্গে। কেউ কেউ নানা বুদ্ধি করে অনুমতি নিয়ে আসে, কিন্তু গ্রামীণফোন অনুমতি পায়নি। নরওয়ে থেকে মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসে এখানকার সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রদূত কথা বলেছেন নানাভাবে নানাজনের কাছে। কিন্তু তারা বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমতি পায়নি।
এভাবে যদি বলেন—এই যে নানা উত্থান-পতন, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ঘটনার মধ্য দিয়ে কিন্তু প্রথম আলোকে যেতে হয়েছে—চাপের মধ্যে, ভয়ের মধ্যে, আক্রমণের মুখে, নানা রকম মামলা-মোকদ্দমা এবং সন্দেহের চাপে থেকে।
আপনি যেটা শুরুতে বলছিলেন—আমরা বলতাম যে প্রথম আলোকে আমরা প্রকাশ্যে সর্বত্র একটি ভালো কাগজ, একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ কাগজ করতে চাই। অবশ্যই এটিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল কাগজ করতে চাই। এটা আমাদের প্রকাশ্য বক্তব্য ছিল।
নিজে আয় করে চলার ফলে আমাদের কখনো কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোনো কোম্পানির কাছে গিয়ে হাত পাততে হয়নি। মালিকের কাছে গিয়ে বলতে হয়নি, ‘আমাকে কিছু টাকা দিন।’ এটাই আমাদের একটি শক্তি।
আরেকটা বিষয়—প্রথম দিন থেকে আমরা ট্যাক্স দেওয়া, ভ্যাট দেওয়া—এসব বুঝতাম না, জানতাম না। লতিফুর রহমান সাহেব বলেছিলেন, ‘আপনারা মানুষকে ট্যাক্স দেওয়ার কথা বলবেন, নিজেরা দেবেন না—এটা তো হতে পারে না।’ প্রথম দিন থেকে আমরা ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদি সবকিছু ঠিক রেখেছি। পরে তো আপনি দেখেছেন—পত্রিকায় যে ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদির বিষয়ে আমরা সরকারের মাধ্যমে আটবার স্বীকৃত, সম্মানিত হয়েছি—প্রথম আলো এবং প্রথম আলো সম্পাদক।
আপনাকে এটা বলতে আমার দ্বিধা নেই—দুই সরকারপ্রধানই আমাকে দুবার এই বিষয়ে বিপদে ফেলতে চেয়েছিলেন। যেহেতু আমাদের ট্যাক্স ফাইল, ভ্যাট ফাইল পরিষ্কার, পারেননি। ওটাতে যদি কোনো ঝামেলা বা গোলমাল থাকত, এই পত্রিকা নিয়ে আমাদের অবস্থান আমরা টিকিয়ে রাখতে পারতাম না। অর্থাৎ আপনি পত্রিকা করুন, ব্যবসা করুন—যা কিছু করুন, সৎ থাকবেন, ভ্যাট-ট্যাক্স দেবেন—তাহলে আপনি বুক ফুলিয়ে চলতে পারবেন, না হলে পারবেন না।
তারপর আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলাম ২০২২ সাল থেকে—ডিজিটাল ফার্স্ট। এর দুই বছর পরে এল মোবাইল ফার্স্ট। তারপরে দুই বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে ভিডিও ফার্স্ট। এখন এআই ফার্স্ট। এখন বলা হচ্ছে যে নিউজপেপার কোম্পানিগুলোকে এআই কোম্পানিতে পরিণত হতে হবে—আরেক চ্যালেঞ্জ।
তারপরে আমি বলব—আমরা প্রথম আলোতে এই সবগুলো পার হয়ে বা একসঙ্গে করতে করতে, এআইয়ের ওপর ভীষণ জোর দিয়েছি। আমরা এটা দেখতে পাচ্ছি—এআই প্রয়োগ করে শুধু বার্তাকক্ষ নয়, প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদের সাংবাদিকদের কাজের, সম্পাদকদের কাজের বহুমুখী সুবিধা পাব।
সর্বশেষ খবর হলো একটি কোম্পানির সঙ্গে মিলে আমরা ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপারে কাজ করছি। যেসব এআই টুলস ব্যবহার করার কথা—আমাদের প্রতিটা কম্পিউটারে, প্রতিটা ক্ষেত্রে সেগুলো যুক্ত করে দ্রুত আমাদের সাংবাদিকেরা কাজ শুরু করতে পারবেন।