বাংলাদেশ

‘আমার কোনো অভিযোগ নাই, আল্লাহর কাছে বিচার দিসি’

September 19, 2026
4 weeks ago
By SAJ
‘আমার কোনো অভিযোগ নাই, আল্লাহর কাছে বিচার দিসি’

চুরির অভিযোগ তুলে খুলনায় বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) হল রোডের একটি ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত শিক্ষার্থীর নাম মো. আজমল হোসেন (২২)। তিনি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন আজমল খুবির খানজাহান আলী হলের বিপরীত পাশের গলিতে পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় একটি মেসে। তিনি চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে।

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর আজমল হোসেন তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তেমন কিছু জানে না। আজমলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাঁদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হল গেটের বিপরীতে আকিব নামের এক ব্যক্তির পাঁচতলা একটি ভবনের পুরোটাই ছাত্রদের মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে চারতলায় আজমল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এবং বর্তমান কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে থাকতেন।

রাতে চিৎকারের শব্দ শুনে বাইরে বের হয়েছিলেন পাশের ভবনের এক নারী ও দুই পুরুষ। তাঁদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছে প্রথম আলো, তবে তাঁরা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। মেসটির কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ওই তিনজন জানতে পারেন, মেসের আরেকজনের ভাত খেয়ে ফেলেন আজমল নামের এক ছাত্র। এর জের ধরে তাঁকে ছাদে নিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ছাদ থেকে পড়ে যান আজমল। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

খবর পেয়ে শনিবার ভোরে চুয়াডাঙ্গা থেকে আজমলের বাবা কুতুব উদ্দিন খুলনায় আসেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, শুক্রবার রাতে আজমল মুঠোফোনে বলে মেসে তাঁর বিরুদ্ধে ভাত চুরি করে খাওয়া এবং কিছু টাকা চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ জন্য এক লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে।

কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তখন আমি বললাম এখানে কিডা আছে, বলল (ছেলে), “ওরা সবাই আছে”।’ আমি বললাম, দে তো (কোনো একজনকে কথা বলিয়ে দে)। ফোন দিলে ওরা বলসে, “চাচা, আপনার ছেলে এমন করসে, আপনি এক লাখ টাকা নিয়ে চলে আসেন।’

ফোন পেয়েই খুলনায় আসার জন্য ট্রেনে ওঠেন বলে জানান কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ফোনের পর ফোন দিচ্ছি, কিন্তু ফোন ধরে না। ফোন ছিল অফ। এই অবস্থায় পৌঁছালাম, ছয়টা কত জানি বাজে। পৌঁছিয়ে খোঁজ করছি, খোঁজ করছি, করতে করতে ওই রুমে গেলাম, পালাম। অনেক খোঁজার পরে এক মুরব্বি চাচা বলল, “বাবা, আপনার ছেলেকে রুমের যে লোক ছিল ওরা মাইরে ফেলেছে”।’

এরপর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ পান বলে জানান কুতুব উদ্দিন। সেখান বেলা সোয়া তিনটার দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিসি। আমি চাস্সি না যে, আমি কোর্ট–কাচারি করবো। বিচার করবেন তিনি (আল্লাহ)। আমার কোনো অভিযোগ নাই। চাস্সি না যে আমাক ছেলেকে কাটাকুটি করুক। কাটাকুটি বাদে যাতে আমি যেতে পারি, এমন একটা ডিসিশন নিসসি।’

খুলনা মে‌ডি‌কেল ক‌লেজ হাসপাতা‌লের সার্জা‌রি বিভা‌গের সহকা‌রী রে‌জিস্ট্রার মো. কনক হো‌সেন বলেন, শুক্রবার রাত পৌ‌নে একটার দি‌কে আজমল হো‌সেনকে গুরুতর আহত অবস্থায় নি‌য়ে আসা হয়েছিল। তাঁর শরী‌রে একা‌ধিক আঘা‌তের চিহ্ন পাওয়া যায়, এ ছাড়া চুল কাটা ছি‌ল। আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেওয়ার প্রস্তু‌তিকা‌লে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রাথ‌মিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ওই তরুণের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

খুলনা নগরীর হরিণটানা থানার পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। থানার ওসি ইকবাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাতে তিনি শুনেছেন চুরির অভিযোগে ঝামেলা হয়েছে। সকালে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজমল নামে এক ছাত্রকে চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ওই ছাত্র ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। এরই মধ্যে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। নিহত তরুণের পরিবার মামলা করতে রাজি হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।