খেলা

বাবা চেয়েছিলেন ছেলে হোক ডাক্তার, ক্রিকেটের টানে কাশ্মীরের ছেলেটি এখন কোহলিদের সতীর্থ

September 30, 2026
2 weeks ago
By SAJ
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে হোক ডাক্তার, ক্রিকেটের টানে কাশ্মীরের ছেলেটি এখন কোহলিদের সতীর্থ

বাবা স্কুলশিক্ষক। চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। ছেলের ভবিষ্যৎটা নিরাপদ হোক, সেটাই চেয়েছিলেন।। তবে ছেলে চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু। বই-খাতার চেয়ে ক্রিকেট বলটাই বেশি টানত তাঁকে।

কাশ্মীরের বারামুলার ছোট্ট গ্রাম থেকে সেই স্বপ্নের শুরু। পথটা সহজ ছিল না। সুযোগ কম। অবকাঠামো সীমিত। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই থামেননি। এর পুরস্কার— কাশ্মীরের আকিব নবীর গায়ে আজ ভারতীয় জার্সি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গুয়াহাটিতে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আজ ভারতের হয়ে অভিষেক হয়েছে এই পেসারের।

আকিব কি তরুণ কোনো পেসার

আকিবের বয়স ২৯। কম বয়সী কোনো উঠতি পেসার তিনি নন। তিনি যে আজ ভারত দলে জায়গা পেয়েছেন, সেটাও দুয়েক ম্যাচে বিশেষ কোনো পারফরম্যান্সের কারণে নয়। ধারাবাহিকভাবে নির্বাচকদের দরজায় কড়া নেড়ে গেছেন আকিব। নির্বাচকদের চোখে পড়তেও তাঁর সময় তুলনামূলক বেশি লেগেছে। আর এটা অবাক করার কোনো বিষয়ও নয়।

আকিবের গল্পের শুরু যে কাশ্মীরে। ১৯৫৭ সালে বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জম্মু ও কাশ্মীর। কিন্তু এত বছর পরও অঞ্চলটিতে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম মাত্র দুটি। সুযোগ-সুবিধাও সীমিত। তার সঙ্গে দীর্ঘ শীত ভারী তুষারপাত আর কয়েক দশকের চলমান সংঘাত তো আছেই। সব মিলিয়ে ক্রিকেটের অবকাঠামোগত বিকাশ হয়েছে ধীরগতিতে। সেই জায়গা থেকে উঠে এসেছেন আকিব।

শুরুটা হয়েছিল রঞ্জিতে

আকিবের পথচলায় বড় মোড় আসে ২০২০ সালে। সে বছরই জম্মু ও কাশ্মীরের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক। অভিষেকেই ঝাড়খণ্ডের বিপক্ষে নেন পাঁচ উইকেট। সেই থেকে শুরু। এরপর রঞ্জি ট্রফিতে আকিব নবী পারফর্ম করে গেছেন। এই পথচলায় তাঁর পাশে ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার পারভেজ রসুল।

দীর্ঘদিন আকিবের অধিনায়কও ছিলেন তিনি। আকিবের একটি গুণ শুরু থেকেই তাঁর চোখে পড়েছিল-পরিশ্রম আর শৃঙ্খলা। আকিবকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন এভাবে, ‘আমি অনেক দিন ধরে আকিবের অগ্রগতি দেখছি। ওর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, সেটি হলো কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা।’

৪৪ উইকেটেও অপেক্ষা

২০২৪-২৫ রঞ্জি মৌসুমে আকিব নেন ৪৪ উইকেট। পেসারদের মধ্যে ছিলেন সেবার সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। এই পারফরম্যান্সও তাঁকে জাতীয় দলের আলোচনাতে আনতে পারেনি। তখন আকিবের বাবা প্রকাশ্যে হতাশার কথা জানিয়েছিলেন, ‘যখন ভালো খেলেও স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, তখন কষ্ট হয়।’

আকিব ছাড়ালেন নিজেকে

আসলে পরের মৌসুমেই রঞ্জি ট্রফিতে আকিব যা করেছেন, সেটাই তাঁর ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছে। সর্বশেষ রঞ্জির এই আসরে ১০ ম্যাচে তিনি নেন ৬০ উইকেট। এর মধ্যে নকআউটেই নেন ২৬টি। ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। ৬৭ বছরের অপেক্ষার পর জম্মু ও কাশ্মীর যে নিজেদের প্রথম রঞ্জি ট্রফি জিতল, তাঁর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এই আকিবেরই।

টুর্নামেন্টের ফাইনালেও আকিব ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। কর্ণাটকের বিপক্ষে নেন ৫ উইকেট। ব্যাটিং সহায়ক হুবলির উইকেটেও আউট করেন প্রতিপক্ষের দুই মূল ব্যাটসম্যান লোকেশ রাহুল ও করুণ নায়ার। তাঁর দিকে চোখ না দিয়ে উপায় আছে!

এমন পারফরম্যান্সের পর দলটির সাবেক অধিনায়ক পারভেজ রসুল বলেছিলেন এভাবে, ‘আমরা আকিবের কাছে ঋণী। সে আমাদের নতুন পরিচয় দিয়েছে।’

এরপর আর আকিবকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর দিকে চোখ না দেওয়ার সুযোগও ছিল না। কারণ ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে ভারতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যৌথভাবে সর্বোচ্চ আটবার ৫ উইকেট পেয়েছিলেন আকিব। দুই মৌসুম মিলিয়ে উইকেট পেয়েছিলেন ১৮ ম্যাচে ১০৪টি।

আকিবের বিশেষত্ব কী

আকিব নবী গতির ঝড় তোলা পেসার নন। ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে তিনি বোলিং করতে পারেন না। তাঁর শক্তি অন্য জায়গায়। সুইং, সিম আর নিয়ন্ত্রণে। তাঁর রিস্ট পজিশন দারুণ। সিমের কারণে পান লেট মুভমেন্ট।

আকিব দুই দিকেই সুইং করাতে পারেন। শুরুতে তাঁর মূল অস্ত্র ছিল আউটসুইং। এরপর যোগ করেছেন ইনসুইং। এখন একই জায়গা থেকে দুই ধরনের বল করতে পারেন। ব্যাটসম্যানেরা বুঝতেই পারেন না, বলটা ঢুকবে নাকি বের হবে। তাঁর লেট সুইংও বড় অস্ত্র। বল খুব বেশি বাঁক নেয় না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দুই-তিন ইঞ্চি মুভ করে।

ব্যাটসম্যানের জন্য সেটাই যথেষ্ট। এর সঙ্গে যোগ করুন লাইন-লেংথে অসাধারণ ধারাবাহিকতা। একই জায়গায় বারবার বল ফেলতে পারেন। এ ছাড়া ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা বুঝে পরিকল্পনা বদলাতে পারেন।

এ কারণেই আকিব এখন ভারতের ওয়ানডে একাদশে। টেস্ট একাদশে সুযোগ পাওয়ায় এখন সময়ের ব্যাপার। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কার সিরিজেও ভারতের স্কোয়াডে ছিলেন আকিব। ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি।