বিনোদন

বিচ্ছেদের কথা শুনেই প্রেমিকা হত্যা! তথ্যচিত্রে সেই ভয়ংকর ঘটনা

January 29, 2026
2 months ago
By SAJ
বিচ্ছেদের কথা শুনেই প্রেমিকা হত্যা! তথ্যচিত্রে সেই ভয়ংকর ঘটনা

‘এলোয়া দ্য হোস্টেস: লাইভ অন টিভি’—নেটফ্লিক্সে গত ১২ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া এই প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে গেছে ব্রাজিলের সাও পাওলোকে নাড়িয়ে দেওয়া ২০০৮ সালের এক ভয়াবহ ঘটনার গভীরে। তখন ২২ বছর বয়সী লিন্ডেমবার্গ আলভেস তাঁর সাবেক প্রেমিকা, ১৫ বছরের কিশোরী এলোয়া ক্রিস্টিনা পিমেন্তেলকে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে জিম্মি করে রাখে।

২০০৮ সালের ১৮ অক্টোবর আলভেস গুলি করলে এলোর মৃত্যু হয়। তবে প্রামাণ্যচিত্রজুড়ে এলোর কণ্ঠ শোনা যায়—তার ডায়েরির সদ্য প্রকাশিত অংশের মাধ্যমে। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে সাও পাওলোর সান্তো আন্দ্রে এলাকায় তার অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে জড়ো হওয়া মানুষের ভিড়, সংবাদমাধ্যমের লাইভ কাভারেজ এবং এলোর পরিবার, এক বন্ধু, তদন্তে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও ব্রাজিলীয় সাংবাদিকদের একান্ত সাক্ষাৎকার।

এই প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে এই জিম্মি সংকট শুরু হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে কীভাবে তা ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়ায়।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এলোর অপহরণএলোয়া আগে লিন্ডেমবার্গ আলভেসের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন। একসময় ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি, আমি কাউকে এতটা ভালোবাসতে পারব, যেমনটা ওকে ভালোবাসি।’

কিন্তু পরের লেখাগুলোয় উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। সেখানে দেখা যায়, আলভেস প্রায়ই বাজে আচরণ করতেন এবং দুজনের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া হতো। ডায়েরিতে এলোয়া শক্তি চেয়ে প্রার্থনা করেন—‘যিশু, আমাকে সাহায্য করো। আমি এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমি হাল ছেড়ে দিতে চাই। প্রভু, তুমি বিষয়টা সামলে নাও। আমাকে দেখাশোনা করো।’

প্রামাণ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া এক বন্ধু জানান, আলভেস এতটাই ঈর্ষান্বিত ছিলেন যে এলোয়া অন্য কারও সঙ্গে সময় কাটালেই সমস্যা করতেন। ফলে তিনি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হওয়াও কমিয়ে দেন।

পরিচালক ক্রিস ঘাত্তাস বলেন, ‘সম্পর্কটা একসময় দমবন্ধকর হয়ে ওঠে। সেটা আর ভালোবাসা ছিল না, বরং মালিকানার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।’

২০০৮ সালে কোনো এক সময় এলোয়া আলভেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আলভেস তা মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, এলোয়া যেন তার ‘সম্পত্তি’। যদি সে তার না হয়, তবে আর কারও হবে না—এই মানসিকতা থেকেই ১৩ অক্টোবর, ২০০৮-এ তিনি এলোয়াকে জিম্মি করেন।ঘাত্তাস বলেন, ‘লিন্ডেমবার্গ সম্পর্কের শেষটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, এলোয়া তাঁর মালিকানাধীন।’

পরিচালকের উদ্দেশ্য ছিল এলোর ডায়েরির মাধ্যমে তাকে এমন একটি কণ্ঠ দেওয়া, যা সে তখন পায়নি—যাতে তাকে একজন শক্ত মনের কিশোরী হিসেবে তুলে ধরা যায়।

কীভাবে উদ্ধার অভিযান চলেছিলএই জিম্মি পরিস্থিতি ধীরে ধীরে রূপ নেয় একধরনের রিয়েলিটি টিভি শোতে। সাও পাওলোর বাসিন্দারা ভবনের সামনে ভিড় করেন, যদি জানালায় একঝলক এলোয়াকে দেখা যায়। সাংবাদিকেরা অ্যাপার্টমেন্টে ফোন করতেন। একবার ফোন ধরেই এলোয়া জানান, সব ঠিক আছে এবং মাকে বলতে বলেন যে তিনি তাকে ভালোবাসেন।পুলিশ এলোর ছোট ভাই ডগলাসকে ব্যবহার করেন আলভেসের সঙ্গে কথা বলার জন্য। ফোনালাপে ডগলাস বলেন, ‘তুমি জানো, আমি শুরু থেকেই তোমার পাশে আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

অন্যদিকে আলভেস বলেন, তিনি বাইরে আসতে পারবেন না, কারণ বাইরে এলে তাকে জেলে যেতে হবে। পাঁচ দিন এবং প্রায় ১০০ ঘণ্টা ধরে চলা এই সংকট ছিল সাও পাওলোর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ জিম্মি পরিস্থিতি। আলভেস দাবি করেন, আত্মসমর্পণ করলে তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি লিখিত গ্যারান্টি। একজন কৌঁসুলি এসে সেই নথি তৈরি করেন, সই করেন এবং দড়ির সাহায্যে সেটি ওপরের তলায় পাঠানো হয়।

এরপর একপর্যায়ে আলভেস নিজেই পুলিশকে বলেন দরজা ভেঙে ঢুকতে। পুলিশ দরজায় বিস্ফোরক ব্যবহার করে। ভেতরে ঢুকে তারা দেখতে পায়, আলভেস এলোয়াকে গুলি করেছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করার এক দিন পর, ২০০৮ সালের ১৮ অক্টোবর এলোর মৃত্যু হয়।

পুলিশ কি আরও কিছু করতে পারত?পরিচালক ঘাত্তাসের মতে, পুলিশ অনেক বেশি সময় ধরে আলোচনা চালিয়ে গেছে, যা হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। প্রথম দিকেই পাশের ভবনে এক স্নাইপার মোতায়েন করা হলেও তাকে গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।ঘাত্তাস বলেন, পুলিশ ভেবেছিল আলভেস কেবল একজন আহত প্রেমিক, যিনি শেষ পর্যন্ত শান্ত হয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি তাঁকে হত্যা করার মানসিকতা নিয়েই অপহরণ করেছিলেন।

ঘাত্তাসের ভাষায়, ‘তারা আলোচনার ওপর ভরসা করেছিল। পরে বুঝতে পারে, সেটা যথেষ্ট নয়…এবং তখন তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আমি বিশ্বাস করি, শুরু থেকেই যদি এটিকে তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকার সমস্যা না ভেবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও আসন্ন হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখা হতো, তাহলে এলোর জীবন বাঁচানো যেত।’

টাইম অবলম্বনে