জীবনযাপন

বড় বোন লতা মঙ্গেশকর কেন আশা ভোসলের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছিলেন

April 12, 2026
5 days ago
By SAJ
বড় বোন লতা মঙ্গেশকর কেন আশা ভোসলের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছিলেন

ভারতের মঙ্গেশকর পরিবার যে দুই বোনের কল্যাণে বেশি বিখ্যাত হয়েছিল, আজ চলে গেলেন তাঁদের দ্বিতীয়জন। আশা ভোসলে—যে নাম দীর্ঘ ৯ দশকে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে উঠেছে। ২০টি ভাষায় যাঁর হাজার হাজার গান শ্রোতার মুখে মুখে ফিরেছে দশকের পর দশক।

প্রায় কাছাকাছি সময়ে ক্যারিয়ার শুরু করা দুই বোন লতা ও আশা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে শ্রোতাপ্রিয় হয়েছেন বিদেশেও। তাই হয়তো তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও মানুষের মধ্যে কৌতূহল ছিল।

আশা মঙ্গেশকর যখন একের পর এক গান রেকর্ড শুরু করেছেন, তখনো তিনি কিশোরী। আর সেই সময়ে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন নিজের ম্যানেজার গণপতরাও ভোসলের সঙ্গে।

তবে তাঁদের এই প্রেম দুই পরিবার থেকেই মানতে চায়নি। তাই মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রেমিক গণপতরাওকে বিয়ে করেন আশা।

এর পর থেকে আশা মঙ্গেশকর পরিচিতি পেতে শুরু করেন আশা ভোসলে নামে। নিজের চেয়ে প্রায় ২০ বছরের বড় ছেলেকে বিয়ে করে বাড়ি ছাড়ার পর থেকে দুই বোনের (লতা ও আশা) মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যায়।

সেই সময়ে লতা মঙ্গেশকর প্রথম সারির সিনেমার শিল্পী হিসেবে নাম কুড়ালেও আশা তখনো উঠতি শিল্পী। বিশেষ করে আশা ভোসলে তখন হিন্দি, মারাঠিসহ নানা ভাষার বি ও সি গ্রেডের সিনেমার গানে কণ্ঠ দেন।

উঠতি ক্যারিয়ার, অল্প বয়সে বিয়ে, নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা আশা শ্বশুরবাড়িতেও সমাদর পেলেন না।

আশা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, তাই দিদি (লতা) আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন কথা বলেননি। তিনি এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি।’

কিন্তু একসময় স্বামীর কাছ থেকেও অবহেলা আর অত্যাচারিত হন আশা। ঘরের এই অশান্ত সময়ে বাইরে তত দিনে একটু একটু করে ভালো সিনেমায় কাজ পেতে শুরু করেছেন।

বর্ষা ও হেমন্ত নামে দুই সন্তানের মা আশা ভোসলে আবারও অন্তঃসত্ত্বা হলেন। বোনের সঙ্গে তখন টুকটাক কথা হতো।

তবে লতার সঙ্গে আশা যোগাযোগ করুন, সেটা চাননি তাঁর স্বামী গণপতরাও ভোসলে। গণপত নাকি একাধিকবার আশার গায়ে হাত তোলেন।

এমনই এক সময়ে আবারও অন্তঃসত্ত্বা আশা ভোসলের সঙ্গে গণপতরাওয়ের তুমুল ঝগড়ার পর বাড়ি ছাড়তে বলেন স্বামী। সেদিনই সোজা এসে ওঠেন মায়ের বাড়িতে। সেখানেই জন্ম হয় তাঁর তৃতীয় সন্তান আনন্দ ভোসলের।

১৯৬০ সালে আশার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় গণপতরাওয়ের। এই বিচ্ছেদের ছয় বছর পর মারা যান গণপতরাও ভোসলে।

‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’ বইয়ে আশা জানিয়েছিলেন, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আশা বলেন, ‘চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে ছিলাম, যেখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল।’

আশার এই তিন সন্তানের মধ্যে বর্ষা ভোসলে ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেন আর মেজ ছেলে হেমন্ত ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২০১৫ সালে। আর ছোট ছেলে আনন্দ ভোসলের সঙ্গেই ছিলেন আশা। মায়ের নামে থাকা আন্তর্জাতিক চেইন রেস্তোরাঁর যে ব্যবসা, সেটা এই আনন্দই সামলাচ্ছেন।

এত সংগ্রামের পরও কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই জানিয়ে আশা বলেছিলেন, ‘সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি। ওই বিয়ে না হলে তো আমার তিন সন্তানকে পেতাম না।’

১৯৫৬ সালের একদিন আশা রেকর্ড করতে এলেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক শচীন দেববর্মনের স্টুডিওতে। সেখানেই প্রথম দেখা শচীনের ছেলে রাহুলের সঙ্গে। তবে সেটা শুধু প্রথম দেখাই।

এরপর তাঁদের রসায়ন জমতে সময় লেগেছে প্রায় ১০ বছর। গণপতর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর পুরোপুরি গানে মনোযোগ দেন আশা।

ষাটের দশক থেকে তিনি হিট গান গাইতে শুরু করেন। রাহুল দেববর্মনের মিউজিকে গান গাইতে গিয়েই কাছাকাছি আসেন আশা। আর রাহুল, মানে পরবর্তী সময়ে যিনি আরডি বর্মন নামে বিখ্যাত হতে চলেছেন, তিনিও তত দিনে আশার কণ্ঠের ভক্ত হয়ে গেছেন। বাস্তব জীবনে জুটি হওয়ার আগেই তাঁদের গান হিট হতে শুরু করে।

‘তিসরি মঞ্জিল’ সিনেমায় এই জুটির গান ইতিহাস তৈরি করল। চারদিকে এই জুটিকে নিয়ে হইচই। এদিকে আরডি বর্মনও তখন রিতা প্যাটেলের সঙ্গে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা নিয়ে একলা চলছেন। নিজেদের এই একাকিত্বই তাঁদের আরও কাছে নিয়ে এল। ষাটের দশকের শেষ দিকে এসে মন দেওয়া–নেওয়া শুরু হয় আশা–আরডির মধ্যে।

প্রথম বিচ্ছেদের ২০ বছর পর আশা দ্বিতীয় বিয়ে করেন এই সংগীত পরিচালক আরডি বর্মনকে (রাহুল দেববর্মন)। তবে সেই বিয়েও শুরুতে মানতে চাননি রাহুলের মা মীরা দেববর্মন।

একে তো আশা তিন সন্তানের মা, তার ওপর আবার রাহুলের চেয়ে বয়সে ছয় বছরের বড়। তবে মায়ের নারাজিতে কাজ হলো না, টলানো গেল না ছেলের প্রেম।

ফলে ১৯৮০ সালে আর ডি বর্মনের সঙ্গে ফের গাটছড়া বাঁধলেন আশা। আশা–আরডি ছিলেন নিঃসন্তান। বিয়ের প্রায় ১০ বছর পর থেকে জীবনযাত্রার পার্থক্যের কারণে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন।

আলাদা থাকলেও আশা কিংবা আরডি কেউই কখনো অন্যকে নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করেননি। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেছেন শেষ দিন পর্যন্ত।

তাই হয়তো জীবনের শেষ রেকর্ড করা গানটাও প্রয়াত স্বামী আরডি বর্মনকে উৎসর্গ করতে পেরেছেন আশা ভোসলে।

তথ্যসূত্র: এনডি টিভি, নিউজ এশিয়া, টিভি নাইন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’