অর্থনীতি

বড় লক্ষ্য নিয়ে বড় বাজেট দিচ্ছে বিএনপি সরকার

June 11, 2026
2 months ago
By SAJ
বড় লক্ষ্য নিয়ে বড় বাজেট দিচ্ছে বিএনপি সরকার

নতুন বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে জোর দিচ্ছে বিএনপি সরকার। এতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও অনেক বেশি ধরা হয়েছে। বাজেট বড় হওয়ায় বড় হচ্ছে বাজেট ঘাটতিও। ঘাটতি পূরণে ঋণও নিতে হবে বেশি।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর জীবনের প্রথম বাজেট। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বিএনপি সরকারেরও প্রথম বাজেট এটি।

অর্থমন্ত্রীর চাওয়া বাজেটের সুফল এবার তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানো। এর অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়ে হতে পারে দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্তত আট ধরনের নতুন কর্মসূচি যুক্ত হচ্ছে। তিনি সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে চান, মনোযোগ দিচ্ছেন সহজে ব্যবসা–বাণিজ্য করার পরিবেশ তৈরিতেও।

অর্থমন্ত্রী চান ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’, যার প্রতিফলন তিনি বাজেটে দেখাবেন বলে কয়েকবারই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রায় সব ক্ষেত্রে তিনি ‘ডিরেগুলেশন’ করবেন অর্থাৎ যতটা সম্ভব সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনবেন।

অর্থের টানাপোড়েনের মধ্যেও আগামী অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাজেটে নতুন বেতনকাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকতে পারে।

প্রথমবারের মতো এবার সিটিজেনস বাজেট অর্থাৎ নাগরিকদের জন্য বাজেট বিষয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এর মাধ্যমে বাজেটকে সহজভাবে বোঝা যাবে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেট এ থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রী কয়েকবার বড় বাজেট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাজেট বড় হলে ব্যয় বাড়বে, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এফবিসিসিআইয়ের পরামর্শক সভায় অর্থমন্ত্রী খোলামেলাই বলেছেন, অর্থনীতি যে জায়গায় আছে, ব্যয় বাড়িয়ে একে ওপরের দিকে না নিয়ে গেলে চলবে না।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে এ হার ৯ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়া যাবে ধরে নিয়ে এবার মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি।

মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই আদায় করতে হবে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। সংস্থাটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আদায় করেছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আদায় লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে জুলাই-এপ্রিল সময়ের ১০ মাসে ঘাটতি রয়েছে ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। ১০ মাসে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে ২৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হচ্ছে এনবিআর–বহির্ভূত আয়। অথচ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এ খাতে ৮ হাজার ১৯২ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। আগামী অর্থবছরে কর ব্যতীত প্রাপ্তি (এনটিআর) থেকে আদায় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনটিআর থেকে আদায় লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

আগামী অর্থবছরে সুদ বাবদ বরাদ্দ রাখা হতে পারে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থ বিভাগ হিসাব করেছিল এবার সুদ ব্যয়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের বিপরীতে এ সুদ দিতে হবে।

সুদ ব্যয়কে বলা হয় বাধ্যতামূলক ব্যয়। সরকারের পরিচালন ব্যয় বা অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে অন্যতম খাত হিসেবে এটি এখন বিবেচিত হয়। এ ব্যয় এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা বাজেটের অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতকে চাপে ফেলছে।

আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) আকার ধরা হচ্ছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। এবার বাজেট ঘাটতি হবে অনুদান বাদ দিয়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

সরকার ঠিক করেছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার এবং বৈদেশিক উৎস থেকে নিট (প্রকৃত) ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেবে। সরকার বাস্তবে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিতে চায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে থাকছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা কম। সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথাও ঠিক করেছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাজেট বড় হচ্ছে ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বাজেটের কতটা বাস্তবায়ন হবে। এক বছরে এত রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি কি সম্ভব? আবার ব্যয় বা ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে যত ঋণ নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, তার বাস্তবতা কম। ফলে ব্যয় ঠিক রাখতে গিয়ে সরকার ভর করবে ঘুরেফিরে ওই অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর, যার সহজ উৎস হচ্ছে ব্যাংকঋণ।

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকঋণ বেশি নিলে ব্যক্তি খাত কম ঋণ পাবে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে এতে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান—এগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন মূল্যস্ফীতি কমাতেও সরকার তেমন কিছু করতে পারবে না।’