বয়স আট, শরীরে বার্ধক্য—তবু স্বপ্ন দেখে মোবাশিরা
মা টাকা দিলে অন্য শিশুরা হয়তো চকলেট কেনে, খেলনা কেনে। আট বছরের মোবাশিরা মোসতারিন সেই টাকা জমিয়ে রাখে। তার স্বপ্ন, এ টাকা দিয়ে একদিন একটা চুলের সুন্দর ক্লিপ কিনবে। অথচ যে মাথায় ক্লিপ পরবে, সেখানে তিন বছর বয়স থেকেই কোনো চুল নেই।
মোবাশিরার বিরল জিনগত রোগ প্রজেরিয়ার (শিশুকালে বুড়িয়ে যাওয়া) সব উপসর্গ আছে। তার ভ্রু নেই, নেই চোখের পাপড়িও। মুখের তুলনায় তার মাথাটা বড়। মুখে বয়স আট, কিন্তু চেহারায় যেন ৬০ বছরের ছাপ। তবু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মোবাশিরা হাসে। নিজেকে সাজায়। সে জানে না, তার শরীর কেন অন্য শিশুদের মতো নয়। শুধু জানে, সে মায়ের কাছে থাকতে চায়, খেলতে চায়, বাঁচতে চায়।
লিকলিকে শরীরের মোবাশিরা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাড়িতে মায়ের কাছেই থাকে। তিন বোনের মধ্যে সে মেজ। হাঁটু, হাত-পায়ের গিঁটগুলো ফোলা। ত্বক কুঁচকে গেছে। শরীরের শিরা-উপশিরাগুলো চামড়ার ওপর স্পষ্ট। পেটটা কিছুটা ফোলা। বাঁকানো নাকটি দেখতে অনেকটা পাখির ঠোঁটের মতো।
চেহারা বয়স্কদের মতো হলেও মোবাশিরা ছোট্ট এক শিশু। প্রজেরিয়া কী—এসব বোঝে না সে। সে জানে, একদিন তার মাথাভর্তি চুল হবে। সেই চুলে ক্লিপ লাগিয়ে আর মায়ের বানিয়ে দেওয়া সুন্দর জামা পরে ঘুরে বেড়াবে সে।
‘মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতী’
গত ১৫ আগস্ট মোবাশিরার মা কোহিনূর আক্তারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জানি না মেয়েটা আর কয় বছর বাঁচবে। তবে মেয়ে খুব বুদ্ধিমতী। আমার জন্য অনেক চিন্তা করে। টাকা পেলে চুলের ক্লিপ কেনার জন্য জমিয়ে রাখে। সেই টাকায় আমার ঋণের কিস্তি দিতে চায়।’
মেয়ের সামনে নিজের কষ্টের কথা বুঝতে দেন না কোহিনূর। কিন্তু আড়ালে গেলেই কান্না আসে তাঁর। তিনি বলেছেন, ‘মেয়ের সামনে কিছু বুঝতে দিই না। কিন্তু পরে কান্না থামাইতে পারি না।’
কোহিনুর বলেন, মেয়ের মাথায় আর চুল গজাবে কি না, তা জানা নেই। কিন্তু মেয়েটি তা মানতে চায় না। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে চুল বানায়। সেই চুলে বড় গোলাপি হেয়ার ব্যান্ড লাগিয়ে রাখে। সাজগোজ করে। এভাবে আয়নায় নিজেকে দেখে, খুশি হয়, হাসে।
‘মেয়েকে হয়তো বউ সাজা দেখব না’
কোহিনূর আক্তারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম ‘মোবাশিরার আম্মু’। অ্যাকাউন্টে ঢুকলেই বায়োতে চোখে পড়ে—‘মোবাশিরা প্রজেরিয়া আক্রান্ত। সবাই দোয়া করবেন। সাপোর্ট করে পাশে থাকবেন। ধন্যবাদ।’
মেয়ের ছবি দিয়ে কখনো সবাইকে শুভ সকাল জানান কোহিনূর। কখনো মোবাশিরাকে লাল টুকটুকে শাড়ি পরিয়ে বিয়ের কনের মতো সাজান। ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। লেখেন, মোবাশিরা মাছ খেতে ভালোবাসে, মোবাশিরা এখন ভালো আছে।
মেয়েকে বউ সাজানোর পেছনে মায়ের একধরনের অপূর্ণতার ভয় কাজ করে। কোহিনূর বলেন, ‘মেয়েকে হয়তো কখনোই বউ সাজা অবস্থায় দেখার সুযোগ পাব না। তাই বউ সাজাই। মেয়ের জন্য সুন্দর জামা বানাই।’
জন্মের সময় মোবাশিরা তাঁর শাশুড়ির মতোই সুন্দর হয়েছিল বলে মনে করেন কোহিনূর। এখনো মায়ের চোখে মেয়েটি সুন্দর।
‘আমার চোখে তো মেয়ে এখনো অনেক সুন্দর। কিন্তু মানুষ খারাপ কথা বলে। মনটা খারাপ হয়’—বলেন কোহিনূর।
ছবির নিচে ভালোবাসা, আবার নিষ্ঠুরতাও
মোবাশিরার ছবি ও ভিডিও দেখে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগই ভালো কথা লেখেন। কেউ দোয়া করেন, কেউ সাহস দেন। তবে মাঝেমধ্যে নিষ্ঠুর মন্তব্যও আসে।
কেউ লেখেন, ‘ওকে তো ভূতের মতো দেখা যাচ্ছে।’ কেউ লেখেন, ‘ওকে দেখে হাসি পাচ্ছে।’
মোবাশিরার খালা সিনহা শিমুও ফেসবুকে নিয়মিত তার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন, ভিউ ব্যবসার জন্য শিশুটির ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে।
সিনহা শিমু কোনো কোনো মন্তব্যের জবাবে লেখেন, প্রজেরিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই মোবাশিরার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
কোহিনূরের কষ্টটা অন্য জায়গায়। মেয়েটি এমনিতেই অন্য শিশুদের মতো নয়। তার ওপর মানুষের কটু কথা তাঁকে আরও ভেঙে দেয়।
রোগের নাম জানতেই কেটে গেল কয়েক বছর
মোবাশিরার শরীরে পরিবর্তন শুরু হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য কম জায়গায় যাননি তাঁর মা–বাবা। চিকিৎসক দেখিয়েছেন, কবিরাজের কাছেও গেছেন। লাভ হয়নি। শুধু টাকা খরচ হয়েছে। মেয়েকে ‘জিনে-ভূতে ধরেছে’—এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাঁদের।
কোহিনূর আক্তার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে মোবাশিরাকে যত চিকিৎসক দেখানো হয়েছে, সবাই বলেছেন বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। তবে দিন যত যাচ্ছে ততই অবস্থা খারাপ হচ্ছে। প্রতি মাসেই জ্বর, সর্দি বা কোনো না কোনো অসুখ লেগেই থাকে। তখন আর মায়ের কোল থেকে নামতে চায় না। সারাক্ষণ কান্না করে।’
কোহিনূর বলেন,‘মেয়েরে কোলে নিয়া হাঁটতে হাঁটতে এমনও সময় গেছে তখন আমি দাঁড়িয়ে ঘুমাইতাম। এখনো ওর শরীর খারাপ থাকলে আমি সংসারের কোনো কাজ করতে পারি না।’
মোবাশিরার রোগের নাম কী—এর উত্তর জানতেই অনেকটা সময় কেটে গেছে অটোরিকশাচালক বাবা মাহবুবর রহমান ও মা কোহিনূরের।
ফেসবুক থেকে জানা গেল রোগের নাম
কোহিনূর জানান, ফেসবুকে মোবাশিরার ছবি দেওয়ার পর তা দেখে অনেকে প্রজেরিয়ার কথা বলেন। তখনই প্রথম রোগটির নাম শোনেন তাঁরা।
১৯৯৯ সাল থেকে প্রজেরিয়া নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও আক্রান্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা করতে কাজ করছে দ্য প্রজেরিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশন (পিআরএফ)। ২০১৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শনাক্ত করতে ‘ফাইন্ড দ্য চিলড্রেন-১০ ইন বাংলাদেশ উইথ প্রজেরিয়া’ নামে একটি ক্যাম্পেইন শুরু করে সংস্থাটি।
চলতি বছর মোবাশিরার পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করে পিআরএফ। মোবাশিরার বাবা মাহবুবর রহমান ও মা কোহিনূর আক্তারকে সম্বোধন করে গত ২২ জানুয়ারি পিআরএফের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি চিঠিতে মোবাশিরার রক্ত সংগ্রহের কথা জানানো হয়।
মোবাশিরার মা বলেন, রক্তের নমুনা দিতে তাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন। মালিবাগের একটি ক্লিনিকে মোবাশিরার হাত থেকে রক্ত নেওয়া হয়। পরে তা নির্দিষ্ট ঠিকানায় কুরিয়ারে পাঠানো হয়। তবে এখনো পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাননি তাঁরা।
কোহিনূর বলেন, ফেসবুকে মোবাশিরার ছবি, ভিডিও দেখে এ বিদেশি ফাউন্ডেশন যোগাযোগ করেছে। এরপরই প্রজেরিয়া নামটির সঙ্গে পরিচিত হন তাঁরা। এখন তিনি বুঝতে পারেন বিশ্বব্যাপী প্রজেরিয়া আক্রান্ত শিশুরা দেখতে অনেকটা একই রকমের হয়ে থাকে।
কেন এত দ্রুত বুড়িয়ে যায় শরীর
প্রজেরিয়া নামটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘প্রজেরোস’ থেকে। এর অর্থ অপ্রাপ্তবয়স্ক বৃদ্ধ। ১৮৮৬ সালে চিকিৎসক জোনাথন হাচিনসন এবং ১৮৯৭ সালে হ্যাস্টিং গিলফোর্ড রোগটি সম্পর্কে ধারণা দেন। তাঁদের নামানুসারে রোগটির নাম হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রজেরিয়া সিনড্রোম।
প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দ্রুত বুড়িয়ে যেতে থাকে। প্রতি এক কোটি থেকে দুই কোটি শিশুর মধ্যে একজনের এ ধরনের জিনগত বিরল অসংগতি দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৩ সালে এলএমএনএ জিন আবিষ্কারের পর রোগটি সম্পর্কে জানা সহজ হয়েছে।
অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, এলএমএনএ জিন শরীরে ল্যামিন এ প্রোটিন তৈরি করে। কোষের ভেতরে নিউক্লিয়াসকে ধরে রাখার জন্য এই প্রোটিন জরুরি। এই জিনে মিউটেশন হলে ভুল প্রোটিন তৈরি হয়। এতে কোষের নিউক্লিয়াস ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ফলে দেহের কোষগুলোর বয়োবৃদ্ধি বা এজিং-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।
এই চিকিৎসক আরও বলেন, শিশুর ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়স থেকেই চোখে পড়ে বয়োবৃদ্ধির লক্ষণ। অল্প বয়সেই শিরায় মেদ জমে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দেখা দেয়। এটি জিনবাহিত রোগ। এখন পর্যন্ত এর চিকিৎসা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। আক্রান্তরা সাধারণত গড়ে ২০ থেকে ২২ বছর বাঁচেন। তবে কেউ কেউ এর চেয়েও বেশি সময় বাঁচেন।
‘বৃদ্ধ শিশু’ বায়েজিদ, নীতু হারিয়ে গেছে
দেশে শৈশবেই বুড়িয়ে যাওয়া শিশু কেবল মোবাশিরা একা নয়। এর আগেও কয়েকজন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।
২০১৬ সালের ৭ আগস্ট প্রথম আলোতে ‘বিরল রোগের শিশুটি এখন ঢাকার হাসপাতালে’ শিরোনামে বায়েজিদ শিকদারকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি ছিল সে।
হাসপাতালে অনেকে কৌতূহল নিয়ে শিশুটিকে দেখতে আসতেন। বায়েজিদ তখন বিস্কুটের প্যাকেটকে বলের মতো করে ছুড়ে ছুড়ে আপনমনে খেলত।
পরের বছর ১২ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ‘সেই “বৃদ্ধ শিশু” আর নেই’ শিরোনামের প্রতিবেদন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে মারা যায় বায়েজিদ।
সে সময় বায়েজিদের বাবা লাভলু শিকদার প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, ২০১২ সালে জন্মের পর থেকেই তাকে বৃদ্ধ মানুষের মতো দেখাত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বার্ধক্যের ছাপ আরও স্পষ্ট হয়। সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিয়েছিল তার।
২০১৬ সালের মে মাসে মাগুরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড বায়েজিদের রোগটি বিরল প্রজেরিয়া বলে শনাক্ত করেছিল।
এরপর আলোচনায় আসে হবিগঞ্জের নীতু আক্তার। ২০১৮ সালে তাকে নিয়ে বিবিসি বাংলাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন নীতুর বয়স ছিল ১১ বছর।
পাঁচ বছর বয়সে ঢাকার চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, নীতু প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত। ২০২৪ সালের জুনে ১৭ বছর বয়সে নিজের বাড়িতে মারা যায় সে।
বিরল রোগ, চিকিৎসাও দুর্লভ
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে ‘বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা-বাবার’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাতে বলা হয়েছে, প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজন বা তার কম মানুষের যে রোগ হয়, তাকে বিরল রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বে প্রায় সাত হাজার বিরল রোগ আছে। এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। প্রায় ৭০ শতাংশ বিরল রোগের শুরু হয় শিশু বয়সে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগ সাধারণত জটিল, একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতে প্রভাবিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সহ-অসুস্থতায় (কো-মরবিডিটি) ভোগে। রোগটি দ্রুত অবনতির দিকে যায়, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়।
বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিরল রোগের এখনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। এসব রোগের ওষুধ ও চিকিৎসা–সংক্রান্ত অন্যান্য পণ্যের দামও অনেক বেশি।
মোবাশিরাদের বেঁচে থাকার গড় বয়স বাড়ছে
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘দ্য কিউরিয়াস কেস অব বেঞ্জামিন বাটন’ ও ২০০৯ সালে ভারতে ‘পা’ সিনেমা মুক্তির পর প্রজেরিয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
প্রজেরিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৪০ থেকে ৮০ লাখ নবজাতকের মধ্যে মাত্র একজনের প্রজেরিয়ার উপসর্গ থাকে। আর প্রতি এক কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি জীবিত শিশুর মধ্যে একজন প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা করানো না হলে এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে গড়ে সাড়ে চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে মারা যায়। সারা বিশ্বে প্রজেরিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আনুমানিক ৪০০।
ইতালীয় গবেষক স্যামি বাসো বেঁচে ছিলেন ২৮ বছর। প্রজেরিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত এবং প্রশংসিত স্যামি ২০২৪ সালের অক্টোবরে মারা যান।
প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত মানেই যে খুব অল্প বয়সে মৃত্যু—বাংলাদেশের তুহিন ইসলাম রাজু তার ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
তুহিনের জন্ম ১৯৯৭ সালে, জয়পুরহাটে। ২০১০ সালে তিনি গণমাধ্যমে আলোচনায় আসেন। তখন তাঁকে দেখতে ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধের মতো মনে হতো।
ওই বছরের ১ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার হয়। তখনকার চিকিৎসকদের কাছে তুহিন প্রজেরিয়া নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস ছিলেন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ।
সে সময় ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে রেকর্ডকৃত তথ্যানুযায়ী তুহিনই প্রথম প্রজেরিয়া আক্রান্ত রোগী।
সেই তুহিনের বয়স এখন ২৯ বছর। মাদ্রাসায় ডিগ্রি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন তিনি। মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০২০ সালে বিয়ে করেছেন। সাড়ে তিন বছরের একটি মেয়েও আছে তাঁর। অটোভ্যান চালিয়ে বাবা, মা, স্ত্রী, ভাইসহ পুরো সংসার চালান।
তুহিন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখতে বয়স্কদের মতো চেহারা। তবে চুল, ভ্রু আছে। ২০১০ সালের পর প্রজেরিয়া নিয়ে আর সেভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তবে বয়স্ক মানুষের মতো অসুখ লেগেই থাকে।’
কিডনি ও মূত্রনালির সমস্যায় ভুগছেন তিনি। মাসে চিকিৎসার পেছনেই খরচ হয় পাঁচ হাজার টাকার বেশি। সব মিলে কষ্ট করে চলতে হয় বলে জানিয়েছেন তুহিন।
ছোটবেলা থেকেই তুহিন শুনে এসেছেন, তিনি বেশি দিন বাঁচবেন না। কিন্তু সেই আশঙ্কাকে পেছনে ফেলে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। সংসারও চালাচ্ছেন।
মোবাশিরা বাঁচতে চায়
আট বছরের মোবাশিরা প্রজেরিয়া কী, তা বোঝে না। জানে না, এই রোগে আক্রান্ত মানুষের আয়ু কেন কমে যায়। জানে না, তার শরীর কেন এত দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে।
সে শুধু জানে, তার মা তাকে সুন্দর জামা বানিয়ে দেন। সে সাজতে পারে। আয়নায় নিজেকে দেখে হাসতে পারে। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে চুল বানিয়ে খেলতে পারে।
ভিডিও কলে কথা বলার সময় মায়ের পাশে ছিল মোবাশিরা। সুন্দর একটি জামা পরা। কে বানিয়ে দিয়েছে জানতে চাইলে এক গাল হেসে জানাল, মা বানিয়ে দিয়েছে।
এরপর আর কথা বলতে চাইল না। অন্য একটি মুঠোফোনে কার্টুন দেখায় মনোযোগ দিল সে।
মোবাশিরা ছোট্ট শিশু। তার কাছে পৃথিবী এখনো কার্টুন, সাজগোজ আর মায়ের কোলের মতোই সহজ। কিন্তু মা কোহিনূরের কাছে প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তার।
কোহিনূর বলেন, মোবাশিরাকে দেখতে অনেকে ভিড় করেন। বারবার বয়স কত তা জানতে চান। অনেক বাচ্চা ওর সঙ্গে মিশতে চায় না। এতে মোবাশিরা খুব রেগে যায়।
মোবাশিরা আর কত দিন বাঁচবে—এই প্রশ্ন প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে কোহিনূর আক্তারকে। তবে মেয়েটা বাঁচতে চায়। মা হিসেবে তিনিও চান, মেয়েটা ভালোভাবে বাঁচুক।
প্রতি মাসে চিকিৎসার পেছনে টাকা খরচ হয়। মেয়েকে একটু ভালো খাবার খাওয়াতে হয়। অটোরিকশাচালক বাবার স্বল্প আয়ে সব সময় তা সম্ভব হয় না। তাই আর্থিকসহ যেকোনোভাবে মোবাশিরাকে কেউ সহায়তা করতে চাইলে তা নিতে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন কোহিনূর।
তবে এই মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়াটা অন্য রকম। তিনি চান, মেয়েটাকে দেখে কেউ যেন হাসাহাসি না করে। কটু কথা না বলে। কারণ, অন্যদের চোখে মোবাশিরা হয়তো ‘বৃদ্ধ শিশু’, কিন্তু মায়ের কাছে সে এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটিই—যে চুল না থাকলেও চুলের ক্লিপ কেনার স্বপ্ন দেখে।