চারটি বড় কেন্দ্রে উৎপাদন কম, বেড়েছে লোডশেডিং
দেশে বিদ্যুতের চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা কাজে লাগছে না। জ্বালানিসংকট, বকেয়া বিল ও কারিগরি ত্রুটির কারণে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে উৎপাদন কমেছে চারটি বড় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রেও। ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (শুক্র-শনি) চাহিদা কমলেও লোডশেডিং কমেনি। বৃষ্টি না হলে আরও কয়েক দিন ভুগতে হতে পারে লোডশেডিংয়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের দুই মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু কয়েক দিন ধরে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। যদিও দিনের অধিকাংশ সময় উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটায় মূলত গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৪৩ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। এ ছাড়া ২২ শতাংশ কয়লাভিত্তিক ও ১৯ শতাংশ ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে গ্যাস-সংকট আগে থেকেই ছিল। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন ক্ষমতা আছে ৬ হাজার মেগাওয়াট। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। এটি মূলত সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।
ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। এখন উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস-সংকটের কথা আগে থেকেই জানা ছিল। গ্যাসের পর কয়লা থেকে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তাই কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সব তৈরি রাখা উচিত ছিল। এ ছাড়া তেলচালিত কেন্দ্রও বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। এসব কেন্দ্র যত বেশি চালানো হবে, তত বেশি ভর্তুকি বাড়বে সরকারের। তাই তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চায় না সরকার।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানিসংকটের মধ্যেও সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। হঠাৎ করে কয়েকটি কেন্দ্রে কারিগরি সংকটের কারণে বিদ্যুতের ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না। এগুলো মেরামতের কাজ চলছে, কয়লার সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। শিগগিরই বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বাড়ানো হবে।
পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সংকট বাড়িয়েছে কয়লাভিত্তিক চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে দুটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। একটিতে কয়লার সংকট ও অন্যটিতে বকেয়া বিলের চাপ। এ চারটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৩৫৪ মেগাওয়াট। গতকাল শনিবার উৎপাদন করা হয়েছে ১ হাজার ৬৬২ মেগাওয়াট। মানে সক্ষমতার মাত্র ৩৮ শতাংশ উৎপাদন করা গেছে। এর বাইরে মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গত দুই দিন উৎপাদন কিছুটা কমানো হয়েছিল। গতকাল রাত থেকেই আবার পুরোদমে উৎপাদন করার কথা।
একক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে এখানে। এপ্রিলে চাহিদা বাড়ার পর কিছুদিন ধরে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে আদানির কেন্দ্রটি। ২২ এপ্রিল কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর উৎপাদন কমে ৭৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। এতে রাজশাহী বিভাগে সরবরাহ কমে লোডশেডিং বেড়েছে। দু-তিন দিনের মধ্যে এটি উৎপাদনে ফিরতে পারে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত সূত্র বলছে, পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরকারিভাবে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ মালিকানায় নির্মিত। কয়লার অভাবে কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। গতকাল সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে কেন্দ্রটি। এ সপ্তাহের মধ্যে চালু ইউনিট থেকে উৎপাদন আরও কিছুটা বাড়ানো হবে। আর আগামী মাসে আরেকটি ইউনিট চালু হতে পারে।
বেসরকারি খাতে চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত চট্টগ্রামের বাঁশখালী কেন্দ্রটির দুই ইউনিট মিলে উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট। বকেয়া বিলের কারণে কয়লা আমদানি ব্যাহত হয়েছে কেন্দ্রটির। তাই প্রথম ইউনিট বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ৬১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। ২৮ এপ্রিল প্রথমটি উৎপাদন ফিরতে পারে।
দেশের নিজস্ব কয়লা দিয়ে পরিচালিত একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারি কেন্দ্রটিতে তিনটি ইউনিট মিলে উৎপাদন সক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট। কয়লা জমে থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিট অনেক পুরোনো, প্রায় নিয়মিত বন্ধ থাকে। ২০২০ সাল থেকে দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ রয়েছে। মেরামতের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়নি।
বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, গত বুধবার রাতে বয়লারের পাইপ ফেটে প্রথম ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ৪৮ ঘণ্টা পর এটি মেরামত করে চালু করা হলেও ১৫ ঘণ্টা পর আবার গতকাল বন্ধ হয়ে গেছে। এটি মেরামত করে উৎপাদনে ফিরতে দুই থেকে তিন দিন লাগতে পারে। তবে এ কেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তৃতীয় ইউনিট, যার উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৫ মেগাওয়াট। এটির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। আগামী ১৫ মে নাগাদ পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। এতে রংপুরের জেলাগুলোতে বেড়েছে লোডশেডিং।
গতকাল রাতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পিডিবি ও পিজিসিবি। সংস্থা দুটির তথ্য বলছে, গতকাল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে ১২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের মতো। এর আগে গত শুক্রবার আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। আজ রোববার এটি আরও বাড়তে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, কয়লা সরবরাহের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। গ্রীষ্মের আগেই এসব প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল। দেশের সব কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারলে বিদ্যুতের ঘাটতি হতো না। বেশি খরচের তেলচালিত কেন্দ্র চালাতে একটি গোষ্ঠী সংকট তৈরি করে রাখছে।