বাংলাদেশ

চায়ের দোকান থেকে তিনতলা বাড়ি, বদলে যাওয়া জীবনের গল্প

August 24, 2026
1 month ago
By SAJ
চায়ের দোকান থেকে তিনতলা বাড়ি, বদলে যাওয়া জীবনের গল্প

একসময় ছিল টিনের বেড়ার ছোট্ট বাড়ি। সংসারে অভাব। সেই অভাব ঘোচাতে ৩৫ বছর আগে ধার করা ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি চায়ের দোকান খোলেন মংলা দাস (৫৮)। ছোট সেই দোকানই পরে হয়ে ওঠে পরিবারের আয়ের ভিত্তি। বাবা মংলা দাসের দেখানো পথে চায়ের ব্যবসায় নামেন ছেলে মানিক দাস (৩৮)। এখন তাঁর দোকানে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি কাপ চা বিক্রি হয়। চা বিক্রির আয়েই হয়েছে তিনতলা বাড়ি, সংসারে এসেছে সচ্ছলতা।

বগুড়ার শেরপুর পৌরসভার বৈকাল বাজারের পাশে তাঁদের বাড়ির নিচেই ‘মানিক রতন কফি হাউজ’। সকাল আটটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এখানে চলে চা-কফির বেচাকেনা। পাঁচ টাকার লাল চা থেকে শুরু করে ৬০ টাকা দামের বিশেষ চা–ও আছে। লাল চা, দুধ চা, কফি ও মালাই চায়ের পাশাপাশি দুধের সর দিয়ে তৈরি হয় নানা মিষ্টান্ন।

অর্থের অভাবে মানিক দাসের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। ছোটবেলা থেকেই বাবার চায়ের দোকানে কাজ করতেন। সেখানেই চা তৈরির কৌশল, ক্রেতার পছন্দ ও ব্যবসার খুঁটিনাটি শিখেছেন। পরে বাবার কাছ থেকে দোকানের দায়িত্ব নেন। পরিশ্রম ও সততায় ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় করেন।

শেরপুর শহরের পাশাপাশি দশমাইল, গাড়িদহ, সেরুয়া, মির্জাপুর, সীমাবাড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তাঁর দোকানে চা পান করতে আসেন। ধুনট উপজেলার দূরবর্তী এলাকার কেউ কেউ বিশেষ মালাই চায়ের স্বাদ নিতেও ছুটে আসেন। সরকারি দপ্তরের কর্মচারীরা ফ্লাস্কে করে দুধ চা নিয়ে যান।

শনিবার বিকেলে দোকানে গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভার কিচেন মার্কেটের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে রাখা চেয়ার ও বেঞ্চে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। কেউ চা পান করছেন, কেউ আড্ডায় ব্যস্ত। কলেজপড়ুয়া তরুণীদেরও দেখা গেল সেখানে। তাঁদের একজন জানান, মানিকের মালাই চায়ের স্বাদ ভালো। তাই মাঝেমধ্যে বান্ধবীদের নিয়ে এখানে আসেন।

শেরপুরের পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থার সভাপতি সোহাগ রায় বলেন, ‘দোকানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চা পরিবেশনের কাপও পরিষ্কার। তাই শেরপুরে এলেই এখানে এক কাপ চা পান করি।’

মানিক দাস বলেন, প্রতিদিন এক থেকে দেড় মণ দুধের চা বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ কাপের মতো চা বিক্রি করেন। দোকানে কাজ করেন চারজন কর্মচারী। ধর্মীয় উৎসব ও সরকারি ছুটির দিনে বেচাকেনা আরও বেড়ে যায়। তাঁর দোকানের বিশেষ আকর্ষণ মালাই চা। এই চায়ের স্বাদ নিতে দূর–দূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন বলে জানান তিনি।

মানিক দাস বলেন, ‘বাবার কাছ থেকেই চা বানানো শিখেছি। ছোটবেলা থেকে দোকানে কাজ করেছি। এখন এই ব্যবসাই আমার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।’

মংলা দাসের চোখে এখন সন্তুষ্টির ছাপ। একসময় যে পরিবারে টিনের বেড়ার বাড়ি ছিল, চায়ের ব্যবসার আয়েই এখন সেখানে হয়েছে তিনতলা ভবন। তিনি বলেন, ‘একসময় টিনের বেড়ার বাড়িতে থাকতাম। ছেলেরা ব্যবসা করে এখন তিনতলা বাড়ি করেছে। বাড়ি করতে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সবই চা বিক্রির আয় থেকে।’

মংলা দাসের দুই ছেলে মানিক ও রতন অর্থের অভাবে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। তবে পড়াশোনা থেমে গেলেও জীবন থেমে থাকেনি। মানিকের চায়ের দোকানের পাশেই তাঁর ছোট ভাই রতন বেকারির ব্যবসা করেন। সংসার চালানোর পাশাপাশি তাঁরা সঞ্চয়ও করছেন। মানিকের একমাত্র ছেলে সীমান্ত দাস। মানিক তাকে ভালো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন।

মংলা দাসের হাত ধরে আরও কয়েকজন শিখেছেন কাজ, গড়ে তুলেছেন নিজেদের জীবিকা। তাঁর দোকানে কাজ করতেন কর্মচারী দুলাল দাস, কমল দাস ও ভজন দাস। তাঁর কাছ থেকেই চা তৈরির কাজ শিখেছিলেন তাঁরা। পরে তাঁর সহযোগিতায় তাঁরা আলাদা দোকান দেন। এখন তাঁদেরও প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

ছোট একটি চায়ের দোকান থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা। সেই দোকানই বদলে দিয়েছে একটি পরিবারের জীবন, পাশাপাশি তৈরি করেছে আরও কয়েকজনের জীবিকার সুযোগ।