বাংলাদেশ

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বন-পাহাড় উদ্ধারে গেলেই হামলা, বনকর্মীদের আটকে রেখে গাছ লুট

August 24, 2026
1 month ago
By SAJ
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বন-পাহাড় উদ্ধারে গেলেই হামলা, বনকর্মীদের আটকে রেখে গাছ লুট

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীর ওপারে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান। এরপরই কোদালা বন বিট। সেখানে চোখে পড়ে পাহাড়ের গায়ে মাটি কাটার ক্ষত, কিছু জায়গায় বসতি স্থাপন আর এখানে সেখানে কাটা গাছের গোড়া।

বছরের পর বছর ধরে কীভাবে বনভূমি দখল হচ্ছে, গাছ উজাড় হচ্ছে তা বুঝতে জুলাই মাসের কয়েক দিন রাঙ্গুনিয়ার কয়েকটি এলাকায় ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদকেরা। কোদালা, নারিশ্চা, চিরিঙ্গা, পোমরা বন বিট ও নিশ্চিন্তপুর বন বিট—সবখানেই প্রায় একই চিত্র। কোথাও পাহাড় কেটে মাটি নামানোর পথ, কোথাও নতুন ঘর, আবার কোথাও কাটা গাছ সরানোর চিহ্ন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বনকর্মীরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বন, পাহাড় ও বালু ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসা সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের অনুসারীরা নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শুধু রাঙ্গুনিয়াতেই বন বিভাগের ২১২ একরের বেশি জায়গা বেদখল হয়েছিল। এর বেশির ভাগই দখলে নিয়েছিলেন হাছান মাহমুদের ভাই এরশাদ মাহমুদ। সরকারের পতনের পর আগস্ট মাসেই (২০২৪ সাল) এরশাদ মাহমুদের দখলে থাকা ২০০ একরের মতো জমি উদ্ধার করা হয়। তবে এখনো বনের জায়গা দখল ও গাছ পাচার থামেনি। রাঙ্গুনিয়ায় এখনো দুই হাজার একর বন বেদখলে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। এর মধ্যে বড় একটি অংশ স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের স্থানীয় নেতা-কর্মীর পরিচয় ব্যবহার করে দখল করা হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পথে পথে বন-পাহাড় উজাড়ের চিহ্ন দেখা গেছে। রাঙামাটি সড়কসংলগ্ন ইসলামপুর ইউনিয়নে কৃষিজমি ও পাহাড় কাটা হয়েছে। দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর ও গলাচিপা এলাকাতেও ব্যাপকভাবে মাটি কাটার চিহ্ন দেখা গেছে।

প্রায় ৩ হাজার ৩০০ একর আয়তনের কোদালা বন বিটের বেশির ভাগই পাহাড়ি বনভূমি। চন্দ্রঘোনা বনগ্রাম, সেগুনবাগান, কলাবাইজ্যাঘোনা, বটতলী, ধুইল্যাছাড়ি, নিশ্চিন্তপুর, ফইট্টাগোদা ও মহুত্বেরঘোনা এলাকা ঘুরে বন দখল, পাহাড় কাটা ও গাছ পাচারের বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কিছুদিন বিরতি দিয়ে পাহাড় কাটা আবার শুরু হয়। সাধারণত রাতে পাহাড়ের মাটি কেটে ট্রাকে তুলে পুকুর, খাল, জলাশয়, ধানি জমি ও বিভিন্ন ভরাট প্রকল্পে নেওয়া হয়।

স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, কোনো কোনো রাতে শতাধিক ট্রাক দিয়ে মাটি নিয়ে যাওয়া হয়।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড় কাটা ও বন দখলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সশস্ত্র লোকবল ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। সীমিতসংখ্যক কর্মীর পক্ষে তাঁদের প্রতিরোধ করা কঠিন। অভিযানে গেলে হামলার ঘটনাও ঘটে।

কোদালা বন বিটের সাবেক ডেপুটি রেঞ্জার কে এম মাহমুদুল হাসান একটি অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয় বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে অন্য বনকর্মীরাও মারধর ও হুমকির শিকার হয়েছেন।

রাঙ্গুনিয়া থানায় করা একটি জিডিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৭ মার্চ রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫ জন অস্ত্রধারী কোদালা বিট কর্মকর্তা খোন্দকার মাহাবুবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের কার্যালয়ে আটকে বাইরে থেকে তালা দেয়। তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। জিডিতে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তিদের হাতে দা, কিরিচ, ছুরি, লোহার রডসহ বিভিন্ন দেশি অস্ত্র ছিল।

বনকর্মীদের আটকে রেখে চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের দক্ষিণ জঙ্গল নিশ্চিন্তপুর এলাকার সেগুনবাগান থেকে ২৪টি সেগুনগাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি থানা-পুলিশ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে বনকর্মীদের হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।

ওই অভিযানে যাওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, বনভূমির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলেই কয়েক শ মানুষ জড়ো হয়। তারা ধাওয়া দেয়।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, সশস্ত্র বনদস্যু ও দখলকারীদের ঠেকাতে গত দেড় বছরে অভিযানের সময় প্রায় ৩০টি গুলি ছুড়তে হয়েছে। দখলকারীরাও পাল্টা গুলি চালিয়েছে। এর আগের দুই বছরে কোদালা বিটের অভিযানে মাত্র দুটি গুলি ছোড়া হয়েছিল।

বনকর্মীদের ভাষ্য, গুলি চালিয়েও পাহাড় কাটা ও দখল পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। একটি দলকে সরানো হলে কিছুদিন পর অন্য পরিচয়ে একই জায়গায় আবার ঘর নির্মাণ শুরু হয়।

একই চিত্র দেখা গেছে চিরিঙ্গা বন বিটে গিয়েও। সেখানকার ফরেস্ট গার্ড খোকন দাস প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় প্রচুর খুনোখুনি হয়। এ জন্য বনকর্মীসহ সবাইকে ঝুঁকিতে থাকতে হয়।

কোদালা বন বিটে একজন ডেপুটি রেঞ্জার, বনকর্মীসহ মাত্র চারজন দায়িত্ব পালন করছেন। এই সীমিত লোকবল দিয়ে গাছ কাটা ও পাচার, বনভূমি বেদখল ঠেকানোর পাশাপাশি মামলা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোদালা বন বিট কার্যালয়ে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কার্যালয়ে রাখা উদ্ধার করা কাঠ, আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করা হয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় কার্যালয়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পটপরিবর্তনের পর চন্দ্রঘোনা-কদমতলী এলাকার বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বন ও পাহাড় দখলে যুক্ত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের তালিকায় কয়েকটি নাম উঠে এসেছে। চন্দ্রঘোনার ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আহমদুল হক, লিচুবাগান সিএনজিচালক সমিতির সভাপতি ও বিএনপি কর্মী আবদুল মান্নান ওরফে মনু, যুবদল কর্মী জুয়েল, তাঁর ভাই মো. সোহেল ও কেফায়েত উল্লাহ।

তবে আহমদুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘উল্টো বন বিটে থাকা সম্পদ আমি রক্ষা করেছি।’ আবদুল মান্নান ও জুয়েলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরাও এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

স্থানীয় ও বন বিভাগের সূত্র জানায়, জুয়েলের ব্যবহৃত একটি কাঠবাহী গাড়ি বিজিবি আটক করে কাপ্তাই বন বিভাগের কাছে জমা দিয়েছিল। সোহেলের বিরুদ্ধে দখল করা বনভূমিতে নির্মিত ঘরবাড়িতে ইট-বালু সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

কোদালা বন বিটের ডেপুটি রেঞ্জার খোন্দকার মাহাবাবুর রহমান বলেন, লোকবল কম হলেও তাঁরা বন রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে এবং পাচারের সময় কাঠও উদ্ধার করা হচ্ছে। তবে তাঁরা সব সময় নানা ধরনের ঝুঁকি ও হুমকির মধ্যে থাকেন বলে জানান তিনি।

হুমকি ও হামলার চেষ্টার বিভিন্ন ঘটনায় রাঙ্গুনিয়া থানায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১০টি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করতে গেলে, বনের জমি ও গাছ কাটতে বাধা দিলে লোকজন জড়ো করে বাধা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বনরক্ষীদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করে। এতে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে উদ্ধার অভিযানে গেলে হামলার চেষ্টা করে দখলকারীরা। সম্প্রতি ধোপাছড়িতে অভিযানের পর এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তবে কোনো তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে যাই। থানা-পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনেরও সহায়তা নেওয়া হয়।’

কোদালা বন বিটের একাধিক অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানান, বন ও পাহাড় দখলকারীরা বড় দল নিয়ে চলাফেরা করে। তাদের অনেকের কাছে অস্ত্র থাকে। অল্পসংখ্যক বনকর্মীর পক্ষে তাদের সামনে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বন দখলমুক্ত করতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। তবে তার আগে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কোনো দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ বন দখল করতে পারবে না।

বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, যে গতিতে বন উজাড় এবং পাহাড় কাটা হচ্ছে, তা চলতে থাকলে ১০ বছর পর এই এলাকায় আর বন অবশিষ্ট থাকবে না। কারণ, চলতি বছরে শুধু কোদালা বিটে ১০০টির বেশি ঘর ওঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তার ভাষায়, এখন ঘরে ঘরে নেতা। রাজনৈতিক উদ্যোগ না থাকলে শুধু বন বিভাগের পক্ষে এই বন রক্ষা করা সম্ভব নয়।