বাংলাদেশ

ঢাকায় আরও ৫০ জায়গায় বসছে স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি, একেকটিতে খরচ ২ কোটি

August 12, 2026
2 months ago
By SAJ
ঢাকায় আরও ৫০ জায়গায় বসছে স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি, একেকটিতে খরচ ২ কোটি

ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীর আরও ৫০টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি সিগন্যালে গড়ে ব্যয় হবে প্রায় ২ কোটি টাকা।

তবে এই অর্থ শুধু সংকেতবাতি বসাতে খরচ হবে না। সিগন্যালের খুঁটি, ভিত্তি, স্টিলের বেড়া, বিদ্যুৎ–সংযোগ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ, সড়ক খনন, ক্যামেরা, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাবসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কেনার পেছনেও ব্যয় হবে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় ২৮টি স্থানে ট্রাফিক সংকেতবাতি বসাতে ব্যয় হবে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি স্থানে ব্যয় হবে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। দুই সিটি মিলিয়ে ৫০টি সিগন্যালে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা। এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও ৫০টি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি চালুর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুই সিটি করপোরেশনকে ৫০ কোটি টাকা করে মোট ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত বাতি স্থাপনের কাজ শুরু করা হবে। তবে কাজ শুরুর সময় নিয়ে দুই সিটির কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপনের কাজ মূলত দুই ভাগে করা হবে। একটি অংশের কাজ করবে সিটি করপোরেশনের নিয়োজিত ঠিকাদার। অন্য অংশের কাজ করবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারের কাজের মধ্যে রয়েছে সিগন্যালের দুই পাশে ৫০ মিটার করে স্টিলের বেড়া নির্মাণ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ তৈরি, বাতির খুঁটির ভিত্তি ও খুঁটি নির্মাণ, বিদ্যুতায়ন এবং সড়ক খনন বা কাটার কাজের মতো পূর্তকাজ।

অন্যদিকে বুয়েট ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন করবে। সংকেতবাতি, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাব, ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। পাশাপাশি যানবাহনের চলাচলসংক্রান্ত জরিপও করবে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থাৎ শুধু সিগন্যাল বাতি স্থাপন নয়, এর সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

ডিএনসিসির হিসাব বলছে, ২৮টি স্থানে ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপনের পূর্তকাজে ব্যয় হবে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে স্টিলের বেড়া নির্মাণে। সংকেতবাতির খুঁটি নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। খুঁটির ভিত্তি তৈরিতে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ এবং বিদ্যুতায়নে ৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বক্স, সড়ক খনন, ট্রাফিক সাইনসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা।

এর বাইরে বুয়েটের পরামর্শ, সংকেত বাতি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় হবে প্রায় ১২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ডিএনসিসির ২৮টি সিগন্যালে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ডিএসসিসির ২২টি স্থানে সিগন্যাল বাতি বসানোর পূর্তকাজে ব্যয় হবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আর বুয়েটকে দেওয়া হবে প্রায় ৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যয় হবে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা।

এই হিসাবে উত্তর ও দক্ষিণ সিটির প্রতিটি স্থানে একটি সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনে গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা করে ব্যয় হচ্ছে।

যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি মোড়ে নতুন করে সংকেতবাতি বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব বাতি বসাতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

প্রাথমিকভাবে ঢাকা দক্ষিণের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ও বাংলামোটর এবং ঢাকা উত্তরের সোনারগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেট মোড়ে এসব সংকেতবাতি বসানো হয়েছিল। পরে এসব সিগন্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ক্যামেরা যুক্ত করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। দুই সিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের ভাষ্য, এতে যানজট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।

গত মে মাসে কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছোটন বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আগে গাড়ি থামাতে যুদ্ধ করতে হতো। এখন লাল বাতি জ্বলে উঠলেই থেমে যাচ্ছে। শান্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারছি। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো সমস্যা সৃষ্টি করছে।’

বুয়েট এসব বাতি তৈরি করে। পরে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বুয়েট এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যৌথভাবে এ পরীক্ষামূলক সিগন্যাল ব্যবস্থার তদারকি করে।

জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংকেত ভঙ্গকারীদের তাৎক্ষণিক জরিমানা করায় আইন মানার প্রবণতা বেড়েছে। তাঁর মতে, আইনের নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ ট্রাফিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

ডিএনসিসির যে ২৮টি স্থানে নতুন ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপন করা হবে, সেগুলো হলো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদ গেট, গণভবন, মোহাম্মদপুর থানা, কলেজ গেট, টেকনিক্যাল, মাজার রোড, মিরপুর-১, সনি সিনেমা হল, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মিরপুর-৬, মিরপুর-১৪, আগারগাঁও, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পরিকল্পনা কমিশন, গুলশান ক্লাব, গুলশান আজাদ মসজিদ, গুলশান-১, গুলশানের ডোমিনোজ ক্রসিং, পুলিশ প্লাজা, নিকেতন, তেজগাঁওয়ের পুরোনো আড়ং, শান্তা টাওয়ার, তেজগাঁও-মহাখালী লিংক রোড, বিওয়াইডি শোরুম, রেইনবো ক্রসিং এবং হাতিরঝিল-মগবাজার ক্রসিং।

আর ডিএসসিসির ২২টি আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি-৬, ধানমন্ডি-৭, কলাবাগান, রাসেল স্কয়ার, ধানমন্ডি-২৭, কাঁটাবন, বাটা সিগন্যাল, কাকরাইল, বিজয়নগর, ফকিরেরপুল, দৈনিক বাংলা মোড়, বঙ্গভবন, গুলিস্তান স্কয়ার, জিপিও, পল্টন মোড়, গ্রিন রোড, মগবাজার মোড়, মিন্টো রোড ও অফিসার্স ক্লাব ক্রসিংয়ে নতুন বাতি বসবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নতুন সিগন্যালব্যবস্থা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করলে ফলাফল আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা যেত। তবে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় এ প্রযুক্তি প্রয়োজন। পাশাপাশি লেন ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য ট্রাফিক শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করতে হবে।

নতুন সংকেতবাতি স্থাপনের কাজ কবে শুরু হবে, তা নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম প্রথম আলোকে বলেন, দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই কাজ শুরু করা হবে।

অন্যদিকে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান বলেন, দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সেটি প্রক্রিয়াধীন আছে। প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

ঢাকার দুই সিটির ট্রাফিক প্রকৌশল বিভাগ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বুয়েট যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।