বাংলাদেশ

দুটি ডিজেলবাহী জাহাজ আনতে বাড়তি ব্যয় ৩৩০ কোটি টাকা 

March 25, 2026
4 months ago
By SAJ
দুটি ডিজেলবাহী জাহাজ আনতে বাড়তি ব্যয় ৩৩০ কোটি টাকা 

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আমদানিনির্ভরতার কারণে এর প্রভাব এখন বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। এ মাসে দেশে আসা দুটি ডিজেলবাহী জাহাজের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে আগের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।

সরকার বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে শুরু করলেও দেশে এখনো জেট ফুয়েল ছাড়া ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে পরিবহন, শিল্প ও উৎপাদন খাতে এখনো সরাসরি বড় প্রভাব পড়েনি। জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর চাপ পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

যুদ্ধের আগে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে মুনাফা করে আসছিল। গত অর্থবছরে সংস্থাটি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। যেমন প্রতি লিটার ডিজেলে ১–২ টাকা, পেট্রল ও অকটেনে ৩–৪ টাকা মুনাফা করছিল বিপিসি। দাম বাড়ার পর এখন বিপিসি প্রতি লিটার ডিজেলে ৬৮–৬৯ টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে দাবি করছেন কর্মকর্তারা। এ পরিস্থিতিতে সরকার কি ভর্তুকি দেবে, নাকি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে এই বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করবে—সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে। একই সঙ্গে সরকারকে বাড়তি দামে খোলাবাজার থেকেও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

তবে গত সোমবার ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, সামনে সময় সহজ নয়। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়বে, জিনিসপত্রের দামও বাড়বে, আর সেই চাপ সয়ে নিয়েই এগোতে হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরানি বাহিনীর বন্ধ ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৪৪ ডলার। গত সোমবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৬ দশমিক ৬০ ডলারে, যা প্রায় ১৬৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে অকটেনের দাম ৭৮ দশমিক ৩৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৬৩ দশমিক ৭১ ডলারে ওঠে, অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১০৮ শতাংশ। জেট ফুয়েলের দাম ৮৯ দশমিক ৪০ ডলার থেকে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ২২৮ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ১৫৫ শতাংশ বেশি। বাড়তি দরে আগামী মাসেও তেল নিয়ে জাহাজ দেশে আসবে।

বিপিসি সিঙ্গাপুরভিত্তিক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটসের সূচক অনুসরণ করে তেল কেনে। তেল জাহাজে তোলার দিনকে ঘিরে আগের দুই দিন, ওই দিন এবং পরের দুই দিনের গড় দাম ধরে প্রতি ব্যারেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে স্বল্প সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় মূল্যবৃদ্ধি হলে আমদানি ব্যয়ে তার দ্রুত প্রতিফলন ঘটে।

বিপিসির হিসাবে, ১৬ মার্চ ‘এমটি চাং হাং হং টু’ নামের একটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ১২৬ ব্যারেল ডিজেল আমদানি করা হয়। যুদ্ধের আগে এই চালানের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ তেলের জন্য এখন ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি জাহাজেই বাড়তি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬২ কোটি টাকা। প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম পড়েছে ১৭০ দশমিক ৯৯ ডলার।

একই রকম পরিস্থিতি হয়েছে ‘এমটি রাফালস সামুরাই’ নামের আরেকটি জাহাজের ক্ষেত্রেও। প্রায় ২ লাখ ব্যারেল ডিজেল নিয়ে ১৪ মার্চ দেশে আসে জাহাজটি। যুদ্ধের আগে এর সম্ভাব্য ব্যয় ছিল প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক জাহাজেই বাড়তি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।

বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইতিমধ্যে সাত জাহাজ ডিজেল ও এক জাহাজ ফার্নেস অয়েল দেশে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

গতকাল উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম এক মাসে দ্বিতীয়বার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। মাসের শুরুতে লিটারে ১৭ টাকা বাড়ার পর এবার বেড়েছে আরও ৯০ টাকা।

দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম এখন প্রতি লিটার ২০২ টাকা ২৯ পয়সা। এর আগে ছিল ১১২ টাকা ৪১ পয়সা। গত মাসে তা ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটারের দাম ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার করা হয়েছে।

দেশে মোট জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেল–নির্ভর। মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশ পূরণ হয় ডিজেল দিয়ে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ টন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি আমদানি করা হয়। বাকিটুকু অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করা হয়। কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি, যা এখনো দেশের বাজারে আগের দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু বিপিসি গত কয়েক বছরে বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে, তাই এই বাড়তি ব্যয় তাদের সেই মুনাফা থেকেই আংশিক সামাল দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে সরকার অন্যান্য খাতের বৈদেশিক ব্যয় কমিয়ে জ্বালানি আমদানিতে ভর্তুকি দিতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ও জনগণ—দুই পক্ষেরই বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। এখনই একটি সুনির্দিষ্ট রেশনিং পদ্ধতি ঘোষণা করা দরকার, যাতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তিতে যাওয়া উচিত হবে না। যুদ্ধের কারণে বাজার প্রতিদিন বদলাচ্ছে। তাই এখন তিন মাসের পরিকল্পনা ধরে এগোনোই বাস্তবসম্মত হবে।