বাংলাদেশ

‘এই রাস্তার পাশে কত বছর ধইরে পইড়ে আছি’

May 17, 2026
2 weeks ago
By SAJ
‘এই রাস্তার পাশে কত বছর ধইরে পইড়ে আছি’

খুলনার কয়রা উপজেলার ফতেকাঠি গ্রামের সড়ক ধরে গিলাবাড়ি লঞ্চঘাটের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় রাস্তার ধারে। চারপাশের টিন, গোলপাতা কিংবা খড়ের ঘরের ভিড়ে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিচিত্র ঝুপড়ি। দূর থেকে মনে হয়, রঙিন কাপড় দিয়ে কেউ যেন ছোট্ট কোনো মেলা সাজিয়েছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি একটি পরিবারের বসতঘর।

ঘরটির চাল, বেড়া, এমনকি দরজার পর্দাটুকুও তৈরি হয়েছে নানা রঙের পুরোনো কম্বল আর কাপড় দিয়ে। কোথাও নীল কম্বল, কোথাও বেগুনি রঙের চাদর, কোথাও আবার জীর্ণ কাপড়ের টুকরা সেলাই করে জোড়া দেওয়া। শীতকালে মানুষের কাছ থেকে এসব কম্বল সহায়তা হিসেবে পেয়েছিল পরিবারটি।

গতকাল শনিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের সামনে একটি বালতিতে পানি নিয়ে থালাবাসন ধুচ্ছেন এক নারী। পাশে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। রাস্তা দিয়ে যাওয়া মানুষের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছেন তিনি। নাম তাঁর ছবর আলী শেখ। বয়সের ভারে কণ্ঠ জড়িয়ে আসে, তবু বলতে থাকেন।

ধীরে ধীরে ছবর আলী বললেন, ‘আমরা এই ঘরের মধ্যি ছয়জন মিলে থাকি। নিজেগের কোনো জায়গাজমি নাই। ভিক্ষা করি, মানুষ যা দেয়, তা–ই দিয়া খাই। যদি কোথাও একখান ঘর পাইতাম, আমরা সেইখানে গিয়া থাকতাম। এই রাস্তার পাশে শান্তি নাই। কেউ কেউ আইসে কয়, এই জায়গা তাগের জমি, এইখান থেইকে উঠে চইলে যাতি হবে।’

পাশে বসে থালাবাসন ধোয়ার ফাঁকে কথা বলেন ছবর আলীর মেয়ে আসমা বেগম। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তবু সংসারের গল্প বলতে ভুল হয় না তাঁর।

আসমা বেগম বলেন, ‘আমরা এলাকায় এলাকায় ঘুরি, ভিক্ষা করি। আমার বর আছে, মাঝেমধ্যে আসে। এখন খুলনা শহরে আছে।’ এই ঘরে কারা থাকেন, জানতে চাইলে আঙুল গুনে তিনি বলেন, ‘আমি, আমার বর, দুইডা বাচ্চা, আব্বা আর আম্মা।’

ঘরের চারপাশের এত কম্বল কোথা থেকে এল, প্রশ্ন করতেই শিশুর মতো হেসে ওঠেন আসমা। বলেন, ‘শীতকালে মানুষ দেয়। প্রতিবছর দু-একটা পাই। এইবার জমানো সব কয়টা দিয়া ঘরটা বানাইছি। আবার শীত আইলে খুলে গায়ে দিবানে।’

কম্বলের বেড়ার ফাঁক গলে ছোট্ট একটি পথ ঘরের ভেতরে ঢুকেছে। ভেতরে উঁকি দিলে দেখা যায়, মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে নানা জিনিসপত্র। এককোণে কয়েকটি প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে তার ওপর ছেঁড়া কাপড়ের বিছানা। আরেক কোণে মাটির চুলার ওপর রাখা কালচে একটি কড়াই। পাশে কয়েকটি ভাঙা কাঠের টুকরা। ঘরের মাঝখানে ছোট্ট এক শিশুকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন আসমার মা ফতেমা বেগম।

ফতেমা বেগম বলেন, ‘অনেক মানুষ আসে, ছবি তোলে, আশ্বাস দেয়। কয়, ঘর করে দিবে। কিন্তু কিছুই হয় না। মানুষের কাছে ছবি দিলাম, আইডি কার্ড দিলাম, তাও কিচ্ছু পাইনি।’ এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফতেমা বেগম জানান, এলাকায় সরকারি গুচ্ছগ্রামে ঘর আছে। সেখানে অনেক ঘর খালি পড়ে থাকলেও তাঁদের ভাগ্যে এখনো জোটেনি একটি আশ্রয়।

কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে ফতেমা বেগমের। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘এই রাস্তার পাশে কত বছর ধইরে পইড়ে আছি। রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। ভিক্ষা কইরে যা পাই, তা–ই খাই। মইরে গেলিও কবর দেওয়ার জায়গাডাও নাই।’

ঝুপড়ির সামনে অপরিচিত মানুষ দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘এই ছোট্ট ঘরের ভেতর সবাই একসঙ্গে থাকে। একটা টয়লেটও নেই। হয়তো বিলের মধ্যে বা নদীর চরে গিয়ে কাজ সারতে হয়। মানুষগুলোর একটা থাকার জায়গা খুব দরকার।’

কথার মাঝখানেই ছবর আলী শেখ আবার বলে ওঠেন, ‘আগে পলিথিন টাঙাইয়ে থাকতাম। পরে পলিথিন ছিঁড়া গেলে কম্বল লাগাইছি। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়া এইখানেই পইড়ে থাকি। আমাগের আর কিচ্ছু নাই। শুধু একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এস এম বনিউল ইসলাম বলেন, পরিবারটির মানবিক পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য চেষ্টা চলছে। এর আগে বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারা ঘর তৈরি করে দিতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু পরিবারটির নিজের কোনো জমি নেই। সরকারি খাসজমিতে ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। এখন গুচ্ছগ্রামে তাদের স্থানান্তরের বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।