খেলা

এক শুক্রবারে কার্লোস জানলেন, তাঁর আর কিছুই নেই

September 28, 2026
3 weeks ago
By SAJ
এক শুক্রবারে কার্লোস জানলেন, তাঁর আর কিছুই নেই

বৃহস্পতিবার রাত ১২টা। নিশ্চিন্তেই ঘুমাতে গিয়েছিলেন রবার্তো কার্লোস। তখনো জানতেন না, ঘুম থেকে উঠে শুনবেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটি।  

শুক্রবার হাতে এল একগাদা কাগজপত্র। এমন সব নথি, যেগুলোর অস্তিত্বই জানতেন না তিনি। কাগজগুলো দেখার পর ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো ভয়ংকর সত্যটা। ফুটবল খেলে ২৪ বছরে যা কিছু অর্জন করেছিলেন, তার প্রায় সবই হারিয়ে ফেলেছেন। ঠিক এতটা নাটকীয়ভাবেই ক্যারিয়ারের সব উপার্জন হারিয়ে ফেলার গল্প বললেন কার্লোস। ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ডিফেন্ডার জানিয়েছেন, এজেন্ট ও পারিবারিক সমস্যার কারণে ফুটবল থেকে উপার্জন করা সম্পদের ৯৯ শতাংশই এখন তাঁর নেই।

সম্প্রতি পর্তুগালে আয়োজিত এক ফুটবল সামিটে নিজের জীবনের এই কঠিন অধ্যায়ের কথা বলেছেন ৫৩ বছর বয়সী কার্লোস। খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর মোট উপার্জন আনুমানিক ১৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি। সেই বিপুল অর্থের প্রায় কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই তাঁর কাছে।

কার্লোস বলেছেন, ‘এমন কিছু মানুষের কারণে আমি সমস্যায় পড়েছিলাম, যারা আমাকে শূন্য করে রেখে গেছে। এজেন্ট এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে ফুটবল থেকে যা আয় করেছিলাম, তার ৯৯ শতাংশই হারিয়েছি।’

ঘটনাটির বিস্তারিত অবশ্য জানাননি তিনি। সংশ্লিষ্ট এজেন্টের নামও বলেননি। শুধু জানিয়েছেন, পারিবারিক একটি গুরুতর সমস্যার সঙ্গে এর যোগ ছিল। কী পারিবারিক সমস্যা, সেটাও খোলাসা করেননি কার্লোস। তবে প্রেম ও বিয়ে নিয়ে ক্যারিয়ারজুড়েই আলোচলায় ছিলেন ব্রাজিলিয়ান এই কিংবদন্তি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই লেফটব্যাক সম্প্রতি মরক্কোর ব্যবসায়ী সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ৫৩ বছর বয়সী কার্লোসের তৃতীয় বিয়ে।

প্রথম স্ত্রী আলেকজান্দ্রা পিনহেইরোর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় ২০০৩ সালে। সেই সংসারে তাঁর তিন সন্তান। এরপর ২০০৯ সালের জুনে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়ানা লুকনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় সংসার করার পর ২০২৫ সালের শুরুতে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। এই সংসারে কার্লোসের ২টি কন্যাসন্তান রয়েছে। সব মিলিয়ে ৭ জন নারীর গর্ভে কার্লোসের সন্তান ১১ জন।

কার্লোসের সমস্যার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কেউ জড়িত কি না, তা জানা যায়নি। তবে সর্বস্ব হারানোর সেই সময়টার কথা বলতে গিয়ে তিনি বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন, ‘আমার খুব গুরুতর একটি পারিবারিক সমস্যা ছিল। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় ঘুমাতে গিয়েছিলাম। শুক্রবার একগাদা কাগজপত্র পেলাম, যেগুলো সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। তখনই বুঝতে পারলাম, আমি আমার পুরো ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছি।’

‘পুরো ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছি’ কথাটার মধ্যেই তাঁর কষ্টটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। কারণ, ফুটবলে তাঁর ইতিহাস যে সামান্য নয়!

ব্রাজিলের হয়ে ২০০২ বিশ্বকাপ জিতেছেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও চারটি লা লিগা। ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রজন্মের অন্যতম সেরা লেফটব্যাক হিসেবে। তাঁর সেই বাঁ পায়ের দুরন্ত শট, গতিময় দৌড় আর আক্রমণাত্মক ফুটবল এখনো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

কিন্তু মাঠের সেই সাফল্য তাঁকে জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারেনি। তাই নিজের ভুলের গল্পটা এবার অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে রেখে যেতে চান কার্লোস। বিশেষ করে তরুণ ফুটবলারদের জন্য, ‘আমি ভুল করেছি। তাই তরুণ খেলোয়াড়দের বলব, তারা যেন একই ভুল না করে। আমি সব সময়ই খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কী করব, তা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতাম। একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের ইতিহাস তৈরি করা এবং নিজের ভাবমূর্তিকে কাজে লাগানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

ফুটবল ছাড়ার আগেই পরের জীবনের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন তিনি। ‘যখন আমি ফুটবল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই, তখনই আমার স্পোর্টিং ডিরেক্টরের লাইসেন্স ছিল। একই সঙ্গে আমি অনেক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছিলাম,’ বলেছেন কার্লোস।

মাঠ ছেড়ে দেওয়ার পরও থেমে থাকেননি কার্লোস। মিডিয়ায় কাজ করেছেন। এখন রিয়াল মাদ্রিদের দূত হিসেবে যুক্ত আছেন ক্লাবের সঙ্গে। কিন্তু তাঁর জীবনের এই অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, খেলার বাইরের খেলাটাও কম কঠিন নয়। মাঠে তিনি প্রতিপক্ষকে হারাতেন। কিন্তু জীবনের এই লড়াইয়ে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল অদৃশ্য।

আর সেই অদৃশ্য প্রতিপক্ষই কেড়ে নিয়েছে তাঁর ‘পুরো ইতিহাস’।