গ্রিনল্যান্ড ঘিরে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাচ্ছে ন্যাটো, ট্রাম্পের কাছে অসহায় ইউরোপ
হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পে প্রত্যাবর্তন ইউরোপের বহুদিনের নির্ভার ধারণাকে একরকম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর প্রশাসন ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে ন্যাটোকে এক নজিরবিহীন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের হুমকির কারণে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) কেন্দ্রীয় মূলনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মূলনীতিটি হলো—জোটের কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরে জবাব দেওয়া হবে; কিন্তু এখন জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যই আরেক সদস্যদেশের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে।
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ‘নানা বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা একটি পরাশক্তি। আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করব।’ তাঁর এ কথা এমন এক পুরোনো পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন শক্তিশালীরা যা পারত দখল করত। আর দুর্বলেরা দখলদারি মেনে নিত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে গ্রিনল্যান্ড কেনার কথা বিবেচনা করছে।
তবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর আরেকটি সদস্যদেশের ওপর সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে ন্যাটোসহ সবকিছু থেমে যাবে। একই সঙ্গে সেই নিরাপত্তাব্যবস্থাও (অকার্যকর হয়ে পড়বে), যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে উঠেছে।’
কিন্তু ইউরোপের অন্যান্য নেতা অন্তত প্রকাশ্যে নিজেদের মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। তাঁদের এমন নীরবতার পেছনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা কাজ করছে। তাঁরা হয়তো মনে করছেন-যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো ইউরোপের নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য অপরিহার্য।
ইউরোপয়ী নেতারা হয়তো ভাবছেন, রাশিয়ার মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন হুমকি ইউরোপকে এক জটিল দোটানায় ফেলে দিয়েছে। দোটানাটি এমন, যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে গ্রিনল্যান্ড থেকে দূরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ইউক্রেনের বিষয়ে সক্রিয় রাখতে হবে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
গত সপ্তাহে প্যারিসে এক অনুষ্ঠানে টানাপোড়েনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিরা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকটি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয় এবং কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও আসে।
তবে দিনব্যাপী কূটনৈতিক আলোচনা শেষে সংবাদ সম্মেলনের একটি প্রশ্নে চাপা পড়া অস্বস্তিকর বিষয় সামনে চলে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে প্রশ্ন করেন, ‘আমি জানি, আজ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কথা বলতে আপনাদের অনীহা আছে। কিন্তু ঠিক যে দিন ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ন্যাটোরই এক সদস্যদেশের ভূখণ্ড দখলের কথা বলা হচ্ছে, সেদিন এসব (মার্কিন নিরাপত্তা) প্রতিশ্রুতির মূল্যইবা কতটুকু?’
স্টারমার সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তিনি ডেনমার্কের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেওয়া আগের একটি বিবৃতির প্রসঙ্গ টানেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁকেও একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও জবাব এড়িয়ে যান।
মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পাশে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের ডেনমার্কবিরোধী হুমকির সমালোচনা করতে রাজি হননি। কারণ তাঁদের আশঙ্কা, এতে করে ইউক্রেন শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণ নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রাখতে ইউরোপ এরই মধ্যে অনেক ছাড় দিয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপের নেতাদের তিরস্কার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁরা অনলাইনে মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কেরও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্কও আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতবা রাহমান বলেন, ‘ইউরোপকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তা করার মতো সক্ষমতা ইউরোপের হাতে নেই।’
মুজতবা রাহমান সিএনএনকে বলেন, ‘ইউরোপের অনেক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলতে চান...তাঁরা প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের সমালোচনা করতেও আগ্রহী। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা তা করতে পারছেন না। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার মতো অবস্থানে ইউরোপ নেই।’
মুজতবা রাহমানের মতে, গত বছরের মতো ২০২৬ সালেও ইউরোপের অগ্রাধিকার হলো, ইউক্রেন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সক্রিয় রাখা। এমনকি এ জন্য গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সমঝোতায় আসতে’ ডেনমার্কের ওপর চাপ দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
রাহমানের ভাষ্যমতে, ‘গোড়ার কথা হলো, এ মুহূর্তে ইউরোপীয় নেতাদের কাছে কোনো বিকল্প নেই। কারণ, নিজস্ব সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করতে ইউরোপের তিন থেকে পাঁচ বছর সময়ের দরকার হবে।’
ইউক্রেনে নতুন সামরিক সহায়তার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত কংগ্রেসের অনুমোদন চায়নি। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপকে এক বছরের বেশি সময় ধরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খরচ বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে নিজস্ব প্রতিরক্ষাশিল্প গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ড্যানিয়েল ফ্রাইড সিএনএনকে বলেন, ‘এটা সত্যি যে সামরিক সরঞ্জামের জন্য ইউরোপ স্বল্প মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউরোপের সক্ষমতা প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।’
জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামার শাসনামলে ইউরোপবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ফ্রাইডে বলেন, ‘ইউরোপের প্রতিরক্ষা (সরঞ্জাম) সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। যুদ্ধবিমান কেবল আমরাই তৈরি করি না।’
ফ্রাইডে আরও বলেন, ‘মার্কিনরা যদি চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত রাখেন, তাহলে ইউরোপীয়রা ড্রোনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগাভাগি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
ইউরোপে কেউ কেউ আরও কঠোর ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন। ফ্রান্সের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রাফায়েল গ্লুকসমান বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত গ্রিনল্যান্ডে একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা। তাঁর মতে, এতে করে ‘ট্রাম্পের কাছে একটি শক্ত বার্তা যাবে এবং গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা অক্ষম—এই মার্কিন যুক্তিরও জবাব দেওয়া সম্ভব হবে।’
তবে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক ফেলো মাজদা রুগে মনে করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মোকাবিলা’ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং যত দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে সম্ভব, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জোটগত পদক্ষেপের মাশুল বাড়ানো দরকার, যাতে করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরে আসেন। এটা করতে ‘অসামরিক উপায়ও রয়েছে’ বলে মনে করেন তিনি।
মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরোধী। গত আগস্টে যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা ইউগভের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মাত্র ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তির ব্যবহারকে সমর্থন করেন। ৭২ শতাংশ বিরোধিতা করেন।
ইউরোপের আশা, গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ হয়তো কমে যাবে, যেমনটা গত বছর কমে গিয়েছিল। কিন্তু লন্ডন ও ইউরোপের নানা গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ন্যাটোর সদর দপ্তর ব্রাসেলসের কর্মকর্তারা গ্রিনল্যাল্ড নিয়ে ট্রাম্পের এবারের অবস্থান ভিন্ন বলে মনে করেন। তাঁদের আশঙ্কা, ট্রাম্প এবার হয়তো কিছু একটার শেষ না দেখে থামবেন না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা সিএনএনকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এবার এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, তিনি (ট্রাম্প) এবার কোনো স্বপ্ন দেখছেন না। তিনি এ বিষয়ে ভয়াবহ রকমের সিরিয়াস।’
ইউরেশিয়া গ্রুপের মুজতবা রাহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে আমার মনে হয় না কারও কোনো সরল ধারণা আছে। না বার্লিন, না প্যারিস, না লন্ডন—কারোরই নাই...মার্কিনরা জানে ইউরোপ দুর্বল। শক্তিশালীরা দুর্বলদের শিকার করে। ট্রাম্প প্রশাসন এ নীতিতে চলছে। এই মুহূর্তে ইউরোপের হাতে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই।’
মুজতবা রাহমানের মতে, ‘বর্তমান সময়টা অনেক দেশের জন্য সময় ক্ষেপণের মতো ব্যাপার। পরিস্থিতিকে তারা একটি সেতু বা মধ্যবর্তী সময় হিসেবে দেখছে। ইউরোপ যতক্ষণ না নিজে শক্তিশালী হয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে, ততক্ষণ তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য।’