বাংলাদেশ

গুলিয়াখালী সৈকতে কেন বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে

June 6, 2026
3 hours ago
By SAJ
গুলিয়াখালী সৈকতে কেন বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে

সবুজ ঘাসের চাদরে ঢাকা সমুদ্রসৈকত। এর মাটির আঁকাবাঁকা ভাঁজে জমে রয়েছে জোয়ারের পানি। দেখে মনে হয় ছোট ছোট দ্বীপ। এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে দেখা মেলে হরিণের। এমন সৈকতে বসে সাগরের দৃশ্য দেখার সুযোগের কারণেই অনন্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী। যার কারণে দিন দিন এই সমুদ্রসৈকতে বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যা। তবে সৈকতটিতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ঝুঁকিও। এলাকাটিতে প্রায়ই পর্যটকদের সাগরে ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ পর্যটককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, সাগরে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছেন কেউ কেউ।

গত তিন বছরে গুলিয়াখালী সৈকত এলাকায় সাগরে ডুবে মৃত্যু হয়েছে চার পর্যটকের। একই সময়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে পর্যটক নিখোঁজ হওয়া এবং পরে উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ২০টির বেশি। উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৈকত থেকে নির্বিচারে বালু তোলা, সাঁতার না জেনে পানিতে নামাসহ নানা কারণে গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে।

গুলিয়াখালী সমাজকল্যাণ যুব সংঘের সভাপতি রমজান আলী বলেন, ‘দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০১৯ সালে। সে বছর একজন পর্যটক মারা যান। এর পর থেকে চলতি বছর পর্যন্ত আটজন মানুষ মারা গেছেন। ঢেউয়ে ডুবতে থাকা কিংবা প্রচণ্ড স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।’

যেসব কারণে ঝুঁকি বেড়েছে

উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বিচারে বালু তোলার কারণে সৈকতে ছোট–বড় অনেক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে ভাটির পানির স্রোতে ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি হয়, যেখানে পর্যটকদের ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাঁতার না জেনে পানিতে নামার কারণে অনেকেই ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। আবার কেউ কেউ সাঁতার জানা সত্ত্বেও সাগরের স্রোত মোকাবিলা করতে পারেন না, যার কারণে সাগরে ভেসে যান। বিশেষ করে বর্ষার সময় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে।

এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে সাগরে নামা পর্যটকেরা খেয়ালখুশিমতো দূরে চলে যান। এটিও সাগরে ভেসে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে অভিমত ফায়ার সার্ভিস ও বাসিন্দাদের।

গুলিয়াখালী সমাজকল্যাণ যুব সংঘের সভাপতি রমজান আলী বলেন, ‘২০১৯ সালের দিকে বাঁশবাড়িয়া থেকে নির্বিচারে বালু তোলা হচ্ছে। এর ফলে সৃষ্ট গর্তের ঘূর্ণিপাকে পর্যটকেরা নিখোঁজ হয়ে মারা যায়।

এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, ‘১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোর-তরুণেরা নিষেধাজ্ঞা মানতে চান না। তাঁরাই বিপদে পড়েন বেশি। এ ছাড়া পর্যটন এলাকা ঘোষণার চার বছরেও সৈকতের সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত না করার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।’

জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, গুলিয়াখালী সৈকতের বৈশিষ্ট্য কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা থেকে আলাদা। এই সৈকতের তলদেশ অনেকটা এবড়োখেবড়ো। যার কারণে স্রোতের কবলে পড়ে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার সবগুলোই প্রায় একই স্থানে ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে লাল পতাকা টানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গাছে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও লাগানো হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় গ্রাম পুলিশরাও সব সময় সতর্ক অবস্থানে থাকেন।’

দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন যাঁরা

গুলিয়াখালী সৈকত এলাকায় গত সোমবার চার পর্যটক সাঁতার কাটতে নেমে জোয়ারের পানির স্রোতে ভেসে যান। গ্রাম পুলিশের দুই সদস্য তাঁদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। গত ২৩ মে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আসা পাঁচ শিক্ষার্থী সাঁতার কাটার সময় ডুবে যেতে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকা নিয়ে চারজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও রিফাত হোসেন (১৮) নামের একজন সাগরে নিখোঁজ হন। পরে ১৭ ঘণ্টা পর তাঁর লাশ উদ্ধার হয়।

২০২৩ সালের ৫ জুলাই সাঁতার কাটতে গিয়ে কুমিল্লা থেকে আসা দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়। তাদের একজন জীবিত উদ্ধার হলেও মেহেদী হাসান নামের এক শিক্ষার্থী মারা যায়। মেহেদী হাসান মারা যাওয়ার ১৯ দিন পর একই স্থানে গোসলে নেমে মোহাম্মদ আলী আহসান ও মো. এনায়েত উল্লাহ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইআইইউসির দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হন। এর তিন ঘণ্টা পর তাঁদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ছাড়া প্রায়ই সাগরে ভেসে যাওয়া পর্যটকদের উদ্ধার করার ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি সৈকতটিকে পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সরকার।