হামের বি৩ ধরনে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, ধরনটি পুরোনো
হামের পুরোনো ধরনেই (ভেরিয়েন্ট) দেশের শিশুসহ বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় পরীক্ষাগারে জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করে হামের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। তাঁরা বলছেন, হাম বাইরে থেকে আসেনি।
সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পোলিও, হাম, রুবেলা ল্যাবরেটরি এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দুটি পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণের ফল একই। তাতে জানা গেছে, হামের বি৩ ধরনে দেশের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ধরনটি অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশে সক্রিয়।
এরই মধ্যে দেশে হামে মৃত্যু ৬০০ ছাড়িয়েছে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার (মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত) হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ জন মারা গেছে। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে ৫১১ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৯০ জনের মৃত্যু হলো।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করে, হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা কার্যত হামেই মৃত্যু। রোগ শনাক্তের সীমাবদ্ধতার কারণে নিশ্চিত হামে মৃত্যু বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর নজির নেই। মারা যাওয়া ৫০১ জনের মধ্যে ৮০ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। এই মৃত্যু শুরু হয়েছে এ বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকেই। এখনো মৃত্যু অব্যাহত আছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি অংশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অভিযোগ করে আসছে যে হাম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে হামে মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা দেশে টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ কমে এসেছে। সংক্রমণ কমার কারণে মৃত্যুও কমে আসবে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, দেশে এই সময় শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাতে মৃত্যুও হয়। তাই সব মৃত্যু যে হামে হচ্ছে, তা নয়।’
হামের ধরন জানা গেছে
সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পোলিও মিজেলস রুবেলা ল্যাবরেটরি ২০১৪ সাল থেকে হাম শনাক্ত ও হামের ধরন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুবা জামিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ৩৫টি নমুনার হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করে বি৩ ধরন জানতে পেরেছি।’
খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, এই ল্যাবরেটরি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত। হামের জিন বিশ্লেষণের তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পাঠানো হয়। পাশাপাশি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে মে মাসে ৩৮টি নমুনার হামের জীবাণুর জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে হামের ধরন বি৩ শনাক্ত হয়েছে।
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা বিশ্বে এ পর্যন্ত হামের মোট ২৪টি ধরন শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে অনেক বছর ধরেই বি৩ ধরনটিই প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তবে অন্য একটি ধরনও ছিল।
ভাইরাস বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, ২০১৪ সালে প্রথম হামের বি৩ ধরন শনাক্ত হয়। এরপর ২০১৭-২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় হামের ডি৮ ধরন শনাক্ত হয়েছিল। তার পর থেকে সব সময় হামের বি৩ ধরনই পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘এই ধরনটাই ছড়াচ্ছিল। সুতরাং রোহিঙ্গা শিবির থেকে হাম ছড়িয়েছে—এমন বক্তব্য সঠিক নয়।’
মৃত্যু কমছে না
হামের টিকার ঘাটতি এবং টিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু কমাতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। একে একে মৃত্যু ৬০০ ছাড়িয়ে গেল। শুরু থেকেই হাম ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ছিল বলে অভিযোগ আছে। মার্চ মাসের শুরুর দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্য অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকেরা সংক্রামক জেনেও অন্য শিশুদের সঙ্গে হামে আক্রান্ত শিশুদের রেখেছিলেন। এ নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
হামে আক্রান্ত হলে শিশুর ডায়রিয়া হয়, কান পাকে, চোখে সমস্যা হয়। অনেকের নিউমোনিয়া হয়। মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই মারা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাধিক হাসপাতালে বাড়তি কিছু ভেন্টিলেটর দিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলার নির্দেশ দিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ডিএনসিসি মার্কেটের কোভিড হাসপাতালকে হামের রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করেছে। কিন্তু এসব করেও মৃত্যু কমাতে পারেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যা ঘটেছে, যা ঘটছে, তা খুবই দুঃখজনক। হামের একটা মহামারি হলো, অথচ আমরা তা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করতে পারলাম না। এই ঘটনা সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা পায়নি। এটা মেনে নেওয়া কঠিন।’