বাংলাদেশ

হাসপাতালের জমিতে হচ্ছে আড়ত, অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে

October 11, 2026
1 week ago
By SAJ
হাসপাতালের জমিতে হচ্ছে আড়ত, অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে

ঢাকার আশুলিয়ায় একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের জায়গায় আড়ত তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আড়ত তৈরির মানে হলো জায়গায়টি স্থায়ীভাবে দখল করা। সেখানে আর মেডিক্যাল কলেজ করা হবে না।

যে জমিতে আড়ত হচ্ছে, সেই জমি ছিল কামারপাড়া স্কুল অ্যন্ড কলেজের। স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্র বলছে, ২০১০ সালে স্কুলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি বিদ্যালয়টির জমি থেকে ১৬৪ শতাংশ মেডিক্যাল কলেজের নামে দেয়। মেডিক্যাল কলেজের প্রস্তাবিত নাম রাখা হয় উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, তখন আওয়ামী লীগের দাপট ছিল। তারা মেডিক্যাল কলেজের নাম বঙ্গবন্ধুর নামে রেখে কাজটি করতে চেয়েছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী নেতারা এলাকাছাড়া। বিএনপির নেতা-কর্মীরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। আড়ত নির্মাণ করা হচ্ছে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থে।

কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১৯৭৭ সালে হরিরামপুর সাংস্কৃতিক সংসদ নামের একটি ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন সেই ক্লাবের কার্যক্রম নেই। তবে কয়েকজন সদস্য জীবিত আছেন। তাঁরা কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সদস্য বলেন, এলাকায় ভালো চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। এ জন্য স্কুলের জমিতে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ আমলে প্রস্তাবিত হাসপাতালে বঙ্গবন্ধুর নাম বসানো হয়েছিল অনুমোদন পাওয়ার স্বার্থে। এখন বিএনপি এসে হাসপাতালের জমিই দখলে নিয়েছে।

প্রস্তাবিত হাসপাতালের জমিটি রাজধানীর তুরাগ থানার কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে আশুলিয়ার দিকে গেলে রাস্তার ডান পাশে পড়ে। ৪ অক্টোবর কামারপাড়া গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের জমিতে জোরেশোরে চলছে কাঁচামালের আড়ত নির্মাণের কাজ। আড়ত নির্মাণের জন্য জমির সীমানাপ্রাচীরের একটি বড় অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। দেয়ালে ব্যানার টাঙানো হয়েছে। তাতে লেখা ‘কাঁচামালের আড়ত, দোকান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’

জমিতে বাঁশ ও টিন দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে আড়তের ঘর। কাজ করছিলেন প্রায় অর্ধশত শ্রমিক। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, নির্মাণকাজ কারা করাচ্ছেন। শ্রমিকেরা কথা বলতে রাজি হননি।

প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক সাজিদ হোসেন ৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের জমিতে সবজির আড়তের ছবি তুলতে যান। কাছে যেতেই তিনি দেখতে পান, সেখানে পাঁচজন মিলে এক ব্যক্তিকে মারধর করছেন। ওই ব্যক্তিরা তখন মারধরের শিকার ব্যক্তিকে বলছিলেন, ‘এই কামে আর কথা কইলেই তোরে মাইরা ফালামু।’

সাজিদ হোসেন তখন একটু দূরে গিয়ে ড্রোনের সাহায্যে ছবি তোলা শুরু করেন। একপর্যায়ে আড়ত নির্মাণের তদারকিতে থাকা কয়েক ব্যক্তি তাঁর দিকে তেড়ে আসেন। তখন সাজিদ মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন।

দখলের চেষ্টা আগে থেকেই

 ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর প্রস্তাবিত হাসপাতালের জমিটি দখল করে ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়েছিলেন তুরাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম।

জহিরুল দাবি করেন, তিনি একা কাজটি করেননি। সেখানে আরও একটি পক্ষ ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি তিন মাস স্ট্যান্ড রেখেছিলাম। তখন কামারপাড়া স্কুলকেও টাকা দিয়েছি।’

সমালোচনার মুখে ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে নিতে বাধ্য হন জহিরুল। এখন আড়ত তৈরির কাজটি করছে রফিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মাঠ ভাড়া নিয়ে তিনি কাজটি করছেন। মাসে ভাড়া ১৬ লাখ টাকা।

স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, রফিক কনস্ট্রাকশন জমি ভাড়া নিলেও এটি মূলত একধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা। নেপথ্যে রয়েছেন তুরাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম। তিনিও জমি ভাড়া নিতে দরপত্রে অংশ নিয়েছিলেন, কাজ পাননি। তবে তাঁর সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া কাজ করার সুযোগ কম। তাই রফিক কনস্ট্রাকশন জহিরুলের সঙ্গে সমঝোতা করেছে। রফিকুল বলেন, ‘এটা তো রাজনৈতিক কাজ। তাই সবাইরে নিয়েই কাজ করতে হইব।’

তুরাগ থানা বিএনপির নেতা জহিরুল ইসলাম ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্যসচিব মোস্তফা জামানের অনুসারী। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপি।

মোস্তফা জামান আবার কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি। স্থানীয় সূত্র বলছে, স্কুলের নিয়ন্ত্রণ মোস্তফা জামানের হাতে। তিনি জমিটি ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ভাড়া নিয়েছেন তাঁরই অনুসারীরা। এতে পরস্পর লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মোস্তফা জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, এ বিষয়ে কথা বলবেন কলেজের অধ্যক্ষ। তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি ফোনকল কেটে দেন।

কলেজের অধ্যক্ষ খুরশীদ জাহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন। সূত্র বলছে, জমি ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সম্মতির শর্তে তিনি কলেজে ফিরতে পেরেছেন। কেন হাসপাতালের বদলে আড়তের জন্য জমি ভাড়া দেওয়া হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্কুলের ভালোর জন্য করেছেন।

কাঁচামালের আড়ত নির্মাণের কাজ শুরুর পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর ফেসবুক লাইভে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা একটি ভিডিওতে অন্য নেতা–কর্মীদের এই কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ওই নেতার নাম বিপ্লব হোসেন। নিজেকে তিনি তুরাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বলে পরিচয় দেন। ভিডিওতে বিপ্লব বলছিলেন, ‘তুরাগ থানা বিএনপি নেতৃবৃন্দ যারা যাঁরা আছেন, সবাই চলে আসবেন। সবাই মিলে থাকব আমরা, কাজ করব সবাই মিলে।’

ভিডিওতে স্থানীয় বিএনপি নেতা জহিরুলসহ অন্তত ২০ জনকে দেখা যায়।

ভাড়া কীভাবে, প্রশ্ন

স্কুলের জমিটির মালিকানা মেডিক্যাল কলেজকে হস্তান্তর করা হয় ২০১০ সালে। মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বায়েজিদ সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী জায়গাটি এখনো উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নামে রয়েছে; কিন্তু দখলে কারা রয়েছে সে বিষয়টি আমরা বলতে পারব না।’

প্রশ্ন উঠেছে, হাসপাতালের নামে থাকা জমি স্কুল কর্তৃপক্ষ ভাড়া দিতে পারে কি না। স্কুল ও মেডিক্যাল কলেজের উদ্যোক্তা হরিরামপুর সাংস্কৃতিক সংসদের একাধিক সদস্য বলেন, পুরোটাই হয়েছে বেআইনিভাবে, ক্ষমতার জোরে। এই জমির দাম অন্তত ১০০ কোটি টাকা। মূলত আড়ত প্রতিষ্ঠার নামে জমিটি দখল করা হয়েছে।

৪ অক্টোবর দুপুরে কামারপাড়া মেডিক্যাল কলেজের মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মুকুল আহমেদ। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে হাসপাতাল হবে জানতাম। হাসপাতাল হলে আমাদের জন্য উপকার হতো। এখন আর মনে হয় হাসপাতাল হবে না।’