হাতেকলমের প্রশিক্ষণে তরুণ তুহিন–মার্জিয়াদের ভাগ্যবদল
যশোর সদর উপজেলার বেকুটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কাজী তুহিন। ২০১৮ সালে যখন তাঁর বাবা মারা যান, তখন তুহিন সবে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ায় অর্থকষ্টে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন; মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ছোটখাটো কাজ করলেও মজুরি ছিল খুবই কম।
এ অবস্থায় ২০২৩ সালে কাজী তুহিন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুতের কাজ ও মেরামত বিষয়ে হাতেকলমে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর সামান্য ঋণ নিয়ে নিজেই একটি দোকান দেন। বর্তমানে তুহিন ফ্রিজ, টিভি থেকে শুরু করে যেকোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামত এবং বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ–সংযোগের কাজ করেন। এতে তাঁর মাসে আয় হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি তাঁর দোকানে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও দুজনের।
যশোরের আরেক তরুণী মার্জিয়া আফরিনও পিকেএসএফের একই প্রকল্পের মাধ্যমে বেকিং ও পেস্ট্রি পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন ধরনের বেকিং ও পেস্ট্রি পণ্য, শিঙাড়া, চপ, পেঁয়াজি, ফ্রোজেন খাবার তৈরি করেন। স্থানীয়দের মাঝে তাঁর দোকানের চায়েরও সুনাম রয়েছে। যশোর সদরের ধর্মতলা চাঁচড়া সড়কে মার্জিয়ার দোকান। পাশাপাশি অনলাইনেও পণ্য বিক্রি করেন তিনি। সব মিলিয়ে মার্জিয়ার মাসিক আয় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার বেশি।
মূলত ওস্তাদ-শাগরেদ শিখন পদ্ধতিতে পিকেএসএফের প্রকল্পের মাধ্যমে কাজী তুহিন ও মার্জিয়া আফরিনের মতো দেশের প্রায় ৭৩ হাজার তরুণ দক্ষ কারিগরের কাছ থেকে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার তরুণের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়েছেন; বাকিরা ভালো বেতনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
দেশে বেকার বা নিম্ন আয়ের পরিবারের তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ২০২২ সাল থেকে রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পিকেএসএফ।
সম্প্রতি যশোরে রেইজ প্রকল্পটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সরেজমিন পরিদর্শনে এসব তথ্য জানা যায়। প্রকল্পটির আওতায় প্রশিক্ষণ পাওয়া উদ্যোক্তা, চাকরিরত ব্যক্তি ও প্রশিক্ষণদাতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের নানা গল্প।
পিকেএসএফের কর্মকর্তারা জানান, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২১ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় বেকার থাকে। আবার অনেকে পর্যাপ্ত শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে নিম্নমজুরি ও ঝুঁকিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কাজ করতে বাধ্য হন। এই বেকার ও অদক্ষ তরুণদের একটি অংশকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে রেইজ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দেড় লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে প্রকল্পটির মাধ্যমে। প্রকল্প বাস্তবায়নে পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে ২৫ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন করছে। মাঠপর্যায়ে ৮৯টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে দেশের ৬৪টি জেলার ৪০০টির বেশি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গ্রাফিক ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, হালকা প্রকৌশল, ওয়েল্ডিং, অটোমেকানিক, পোশাক তৈরি ও সেলাই, খাদ্য প্রস্তুতিসহ মোট ২৬টি বিষয়ে (ট্রেড) ছয় মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এই প্রকল্পের আওতায়। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা একদিকে ওস্তাদের কাছ থেকে হাতেকলমে কারিগরি দক্ষতা শেখেন, অন্যদিকে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ের মৌলিক ধারণাও পান। প্রশিক্ষণ শেষে নির্দিষ্টসংখ্যক অংশগ্রহণকারীকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত সনদ দেওয়া হয়।
নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধীসহ সমাজের পিছিয়ে পড়াদের প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যেমন ছোটবেলায় পোলিওতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত লুৎফুন্নেছা মাধ্যমিক পাসের পর আর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকেও নিগ্রহের শিকার হন তিনি। পরে এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনে রেইজ প্রকল্পের অধীনে গ্রাফিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনার কাজও করেছেন।
রেইজ প্রকল্পের অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মূলত ওস্তাদ-শাগরেদ মডেল বা শিখন পদ্ধতিতে। এই মডেলে কোনো বিশেষ কাজে অভিজ্ঞ একজন দক্ষ ওস্তাদ বা মাস্টার ক্র্যাফটসপারসনের (এমসিপি) সঙ্গে থেকে এক বা একাধিক শাগরেদ তথা শিক্ষানবিশ কাজ শেখেন। এতে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সক্ষমতা তৈরি হয়। পাশাপাশি গ্রাহক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা সম্পর্কেও ভালো ধারণা পান। সারা দেশে এমন ১৬ হাজার ওস্তাদের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
যশোর-চুকনগর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এস এম আর অ্যাগ্রোর কারখানায় বিভিন্ন হালকা প্রকৌশল যন্ত্র বানানো হয়। বর্তমানে রেইজ প্রকল্পের তিনজন তরুণ সেখানে কাজ শিখছেন। এর আগে আরও চারজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁদের কাজ শেখাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী এস কে মাহফুজুর রহমান।
মাহফুজুর রহমান বলেন, হালকা প্রকৌশল খাতে কাজের প্রচুর চাহিদা থাকলেও দক্ষ কর্মীর সংকট রয়েছে। তবে রেইজ প্রকল্প থেকে যাঁরা আসেন, তাঁরা কাজের প্রতি অনেক বেশি মনোযোগী থাকেন। তাঁদের কারিগরি দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ের দক্ষতা শেখানো হয়। গ্রাহকদের সঙ্গে আচরণ, দোকান পরিচালনা, দাম নির্ধারণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বাস্তব ধারণা পান তাঁরা। ফলে তাঁরা দ্রুত বাজার উপযোগী দক্ষ হয়ে ওঠেন।
প্রকল্পটির বিষয়ে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের বলেন, দেশের ওস্তাদ-শাগরেদ পরম্পরায় ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রেইজ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি যাঁরা উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী, তাঁদেরও প্রয়োজনীয় সহায়তা ও অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। মূলত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমভুক্ত পরিবারের সন্তানদের সম্পৃক্ত করায় এ প্রকল্প বিশেষভাবে সফলতা অর্জন করেছে।