আন্তর্জাতিক

ইরান সরকার কি এবারের বিক্ষোভ সামাল দিতে পারবে

January 9, 2026
4 months ago
By SAJ
ইরান সরকার কি এবারের বিক্ষোভ সামাল দিতে পারবে

ইরানজুড়ে বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দেশটির ওপর বিদেশি চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট সামাল দিতে পারছে না।

গত মাসে তেহরানে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ ইতিমধ্যে ইরানের ৩১ প্রদেশের সব কটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ বিক্ষোভের মাত্রা এখনো ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া বিক্ষোভের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ইসলামি পোশাক পরার বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক অবস্থায় মাসা আমিনির মৃত্যু হয়।

গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা হঠাৎ ইরানি রিয়ালের দরপতনে ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। ইতিমধ্যে অন্যরাও, বিশেষ করে তরুণেরা এ বিক্ষোভে শামিল হন। মাসা আমিনির ঘটনায় হওয়া বিক্ষোভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নারী ও কিশোরীদের এই বিক্ষোভে কম দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকারবিষয়ক সংবাদ ওয়েবসাইট হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর অন্তত ৩৪ বিক্ষোভকারী ও চার নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশার চিত্র তুলে ধরছে।

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচি–বিষয়ক পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘এটি শুধু রিয়ালের পতন নয়; বরং বিশ্বাসের পতনও।’

ইরানি কর্তৃপক্ষ অস্থিরতা মোকাবিলায় দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণের চেষ্টা করছে। তারা বলছে, অর্থনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে হওয়া বিক্ষোভের ঘটনা বৈধ এবং সংলাপের মধ্য দিয়ে এসব বিষয়ের সমাধান করা হবে। তবে একই সঙ্গে রাজপথে সহিংস সংঘর্ষ চলার মধ্যে বিক্ষোভ দমনে কিছু কাঁদানে গ্যাসের শেলও ব্যবহার করা হয়েছে।

ইসলামি বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পরও ইরানের ধর্মীয় শাসকেরা তাঁদের অগ্রাধিকার ও যুবসমাজের প্রত্যাশার মধ্যকার ব্যবধান ঘোচাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

২৫ বছর বয়সী মিনা পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশত থেকে রয়টার্সের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু শান্তিপূর্ণ, স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চাই…অথচ তার বদলে তারা (শাসকেরা) পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে, অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে।’

ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সংস্কারপন্থী শাখার এক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পোশাকবিধি মেনে চলতে বাধ্য করা থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত যেসব বিষয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল আদর্শিক স্তম্ভ বলে বিবেচিত হয়, তা ৩০ বছরের কম বয়সীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই তরুণদের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম আর বিপ্লবী স্লোগানে বিশ্বাস করে না। তারা মুক্তভাবে বাঁচতে চায়।’

মাসা আমিনি–কেন্দ্রিক আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীরা বাধ্যতামূলক হিজাব পরার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। এখন এ হিজাববিধি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর করা হচ্ছে। অনেক ইরানি নারী জনসমক্ষে হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের রীতিনীতির সঙ্গে স্পষ্টত সাংঘর্ষিক।

চলমান বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের অনেকে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের সমর্থন দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘গাজা নয়, লেবানন নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য’। এর মধ্য দিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলোর প্রতি মানুষের গভীর হতাশার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ইরানের মিত্রদের ওপর ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলাকে কেন্দ্র করে তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবও কমে গেছে। গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি ও ইরাকে মিলিশিয়াদের ওপর আঘাতের পাশাপাশি ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়ার শাসক বাশার আল–আসাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, উত্তর–পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীরা একটি বড় ইরানি পতাকা খুঁটি থেকে নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলছেন। ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে রয়টার্স।

চলতি সপ্তাহে রয়টার্সের যাচাই করা আরেক ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আবদানানে বিক্ষোভকারীরা মিছিল করেছেন।

উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় শহর গোনাবাদ থেকে পাওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণদের একটি দল একটি মাদ্রাসা–মসজিদ থেকে ছুটে বেরিয়ে বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছে, যা ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একধরনের বিদ্রোহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে রয়টার্স এ ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ভাতাঙ্কা বলেন, বারবার বিক্ষোভের মুখে পড়া ইরানি ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা দমন–পীড়ন ও কিছুটা ছাড় দেওয়ার মধ্য দিয়ে বারবারই বিক্ষোভ মোকাবিলা করে আসছে। তবে সে কৌশলও এখন কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে।

ভাতাঙ্কা বলেন, ‘এখন পরিবর্তন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে। সরকারের পতন হতে পারে, তবে তা নিশ্চিত নয়।’

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সিরিয়া, লিবিয়া ও ইরাকের মতো দেশগুলোয় দেখা গেছে, বিক্ষোভ ও সামরিক হস্তক্ষেপ—এ দুইয়ের সংমিশ্রণ ঘটার পরই কেবল দীর্ঘদিনের শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যদি নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তাহলে তিনি ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।

২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা সজ্জিত আছি এবং পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত’। তবে এ ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। তেহরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা চালানোর সাত মাস পর ট্রাম্প এ পোস্ট দেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এখন তাঁর দীর্ঘদিনের শাসনকালের মধ্যে সবচেয়ে অস্থির ঘটনাগুলোর একটির মুখোমুখি। তবে তিনি বলে দিয়েছেন, ইরান শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।

সাবেক এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, দশকের পর দশক ধরে ছায়াশক্তি তৈরি করা, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার মতো নীতি অনুসরণ করে আসছেন ৮৬ বছর বয়সী নেতা খামেনি। তবে এখন এগুলো ভেঙে পড়ার পথে। তাঁর সামনে কোনো সহজ পথ নেই।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিক্ষোভের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত, যেখানে ইরানি জনগণ তাদের ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিচ্ছে।’

বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ আসন্ন বা সম্ভব কি না, তা নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে মতভিন্নতা আছে।

মধ্যাঞ্চলীয় নগর ইস্পাহানের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। ৫০ বছর ধরে এ শাসনব্যবস্থা আমার দেশ পরিচালনা করছে। ফলাফল দেখুন। আমরা গরিব, বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ হয়ে গেছি।’

বিদেশি হস্তক্ষেপ সমর্থন করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘না। আমি চাই না আমার দেশ আবার সামরিক হামলার শিকার হোক। আমাদের জনগণ যথেষ্ট কষ্ট ভোগ করেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ছাড়াই আমরা বিশ্বের সঙ্গে শান্তি ও বন্ধুত্ব চাই।’

নির্বাসিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতাকারীরা দাবি করছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য তাঁরা যে সময়ের অপেক্ষায় আছেন, তা আসন্ন। তাঁরা আরও বেশি বেশি বিক্ষোভ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁরা দেশের ভেতরে কতটা সমর্থন পাবেন, তা অনিশ্চিত।