আন্তর্জাতিক

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা আলোচনা আটকে আছে যেখানে

April 19, 2026
14 hours ago
By SAJ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা আলোচনা আটকে আছে যেখানে

ইসলামাবাদে প্রথম বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা আলোচনা রয়েছে অনিশ্চয়তায়। মার্কিন প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তেহরানের একের পর এক অপরিপক্ব ও অগোছালো বক্তব্য এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

এর ধারাবাহিকতায় ইরান আবারও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি দেশটি তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ঘটনার মোড় পরিবর্তনের সূত্রপাত গত শুক্রবার, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার ঠিক পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একটি এক্স পোস্ট থেকে।

সেখানে আব্বাস আরাগচি লিখেছিলেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ায় এখন থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার ঠিক করে দেওয়া পথ দিয়ে এই জাহাজগুলো যাতায়াত করতে পারবে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি যত দিন থাকবে, এই সুযোগও তত দিন থাকবে।

আরাগচির এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১২ ডলার কমে যায়। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় পাকিস্তানও। শান্তি প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেশটির কর্মকর্তারা তখন তেহরানেই ছিলেন।

তবে আরাগচির পোস্টটি হয়তো অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ ছিল, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তেলের দাম হুট করে পড়ে যাওয়ায় এর প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এ খবরকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব সিদ্ধান্তের জন্য তেহরানকে তিনি ধন্যবাদও জানান।

ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবিও করেছেন, বাজার প্রভাবিত করতেই আরাগচি ওই পোস্ট দিয়েছিলেন।

ইরানি আইনপ্রণেতা মোর্তজা মাহমুদি বলেছেন, এখন যুদ্ধের পরিস্থিতি না থাকলে এক্সে এমন মন্তব্য করার জন্য আরাগচির অভিশংসন হওয়া উচিত ছিল। আরাগচির বিরুদ্ধে বারবার ‘ভুল সময়ে ভুল বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও আনেন তিনি।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রভাবাধীন সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ আরাগচির পোস্টটিকে ‘ভুল অথবা অসম্পূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করে। সংস্থাটি জানায়, ‘প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই পোস্টটি দেওয়া হয়েছে। এতে জাহাজ চলাচলের শর্ত, বিস্তারিত তথ্য ও পদ্ধতি নিয়ে নানা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।’

কায়হানের মতো কট্টরপন্থী সংবাদপত্রগুলো আরাগচির কাছে তাঁর পোস্টটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল।

এমনকি ইরানের অভ্যন্তরে রাজনীতিতে মাহমুদ সাদেগির মতো আরাগচির প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরাও মনে করেন, এই ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে হওয়া উচিত ছিল। তাঁদের মতে, এমন কোনো মাধ্যমে এটি দেওয়া ঠিক হয়নি, যা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।

হরমুজে নতুন করে অচলাবস্থা শুরু হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, আগামী বুধবার দুই পক্ষের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সপ্তাহ থেকেই তিনি আবারও বোমা হামলা শুরু করবেন। এ পরিস্থিতি হরমুজ প্রণালিতে আরেকটি বিপজ্জনক সংঘাতের পথ তৈরি করেছে। যদিও সেখানে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নৌবাহিনীর মধ্যে সরাসরি কোনো যুদ্ধ হয়নি।

আগামীকাল সোমবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপক গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আবার আলোচনায় বসতে রাজি নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ‘অযৌক্তিক’ দাবিদাওয়া তুলেছে।

ইরানের এই কঠোর অবস্থান থেকে বোঝা যায়, দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে এখন আইআরজিসির প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। আইআরজিসি ভয় পাচ্ছিল যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি হয়তো ওয়াশিংটনকে সময়ের আগেই অপ্রয়োজনীয় কিছু ছাড় দিয়ে দিচ্ছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক পোস্ট দেওয়ায় আইআরজিসির ক্ষোভ আরও বাড়ে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং শান্তি আলোচনা দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ট্রাম্পের ওই পোস্টগুলোর অনেক কথাই ছিল মিথ্যা।

পরে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়, ইসলামাবাদে আলোচনায় গালিবাফের সঙ্গী আরাগচি আসলে বলতে চেয়েছিলেন—যেসব জাহাজ আইআরজিসি নৌবাহিনীর অনুমতি নেবে, নির্ধারিত রুট ব্যবহার করবে এবং নির্ধারিত টোল পরিশোধ করবে, শুধু সেগুলোই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই এক সরকারি সাক্ষাৎকারে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনাই হয়নি।

ট্রাম্পের উদ্দেশে গালিবাফ সাফ জানিয়ে দেন, হরমুজ প্রণালি খোলা নাকি বন্ধ থাকবে, তা নির্ধারণ করবে ইরানি সামরিক বাহিনী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো পোস্ট নয়।

যুদ্ধ থামানোর জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প এতটাই মরিয়া যে তিনি সবকিছু খুব দ্রুত শেষ করতে চাইছেন। কিন্তু পরিস্থিতি আসলে পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই। কারণ, এর জন্য ইরানের রাজি হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে ইরান এখনো বিশ্বাস করে, হরমুজ প্রণালি তাদের প্রধান শক্তির জায়গা। পরিস্থিতি তাদের পক্ষেই আছে। তাই আলোচনায় ফেরার জন্য ইরানের কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা অর্জনে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর শুরুটা হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাধ্যমে। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লেবাননে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে চাপ দেন।

ধারণা করা হয়েছিল, এই যুদ্ধবিরতির ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং প্রথম ধাপে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফিরে পাওয়াসহ একের পর এক ঘটনা ঘটবে, যা যুদ্ধ বন্ধের পথে নিয়ে যাবে।

কিন্তু ট্রাম্প অধৈর্য হয়ে আগেভাগেই অনেক বেশি অনুমান করে ফেলেন এবং একের পর এক ঘোষণা দিতে শুরু করেন। এর মধ্যে একটি ছিল—ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

শনিবার সকালে ট্রাম্পের দেওয়া এই ঘোষণাই ইরানের আবার কঠোর হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। শর্তসাপেক্ষে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মাথায় তাঁরা আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। ইরান দাবি করে, তারা ইতিমধ্যে ভারতীয় তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

তেহরান থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় আবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।

এর পাশাপাশি আরও গভীর সমস্যা সামনে এসেছে। ইরান মনে করে, হরমুজ প্রণালির ওপর স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আইনগত ও নৈতিক অধিকার তাদের রয়েছে।

ইরানের আইনজীবী রেজা নাসরি এ বিষয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি সমুদ্রপথ বা প্রণালি তখনই সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, যখন সেটি কেবল যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন সেই পথ ব্যবহার করে সেটির পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের ওপর অন্য দেশ হামলা চালায় বা সেখানে স্থায়ী সামরিক আস্তানা গড়ে তোলে, তখন সেটি আর সাধারণ পথ থাকে না। তখন ওই উপকূলীয় দেশ নিরাপত্তার খাতিরে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার রাখে।