আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল নিয়ে বাংলাদেশে ৭৯ ও যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ মনোভাব নেতিবাচক, সবচেয়ে কম ভারতে

June 6, 2026
5 hours ago
By SAJ
ইসরায়েল নিয়ে বাংলাদেশে ৭৯ ও যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ মনোভাব নেতিবাচক, সবচেয়ে কম ভারতে

বিশ্বের ৩৬টি দেশের অধিকাংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। সেই সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের আস্থা ‘খুব সামান্য’ কিংবা ‘একেবারেই নেই’ বলেও জানান।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পরই মূলত জরিপসংক্রান্ত অধিকাংশ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল।

ইসরায়েল সম্পর্কে মনোভাব

জরিপের আওতাভুক্ত দেশগুলোর গড়ে ৬৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক বা প্রতিকূল মনোভাব দেখিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষের মনোভাব ছিল ইতিবাচক।

জরিপ করা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বা অঞ্চলগুলোয় ইসরায়েলের প্রতি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তীব্র। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে। (তবে গাজা উপত্যকায় কোনো জরিপ চালানো সম্ভব হয়নি।)

এ ছাড়া জরিপের আওতায় থাকা ইউরোপের সব কটি দেশের মানুষই ইসরায়েল সম্পর্কে তুলনামূলক নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। বিশেষ করে ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের প্রায় অর্ধেক বা এর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রতি তাঁদের ‘অত্যন্ত নেতিবাচক’ মনোভাব রয়েছে।

জরিপ করা সাব–সাহারা অঞ্চলের কিছু আফ্রিকান দেশে ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।

তরুণদের মধ্যে বেশি নেতিবাচক মনোভাব

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে।

উদাহরণ হিসেবে, হাঙ্গেরিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের ৭২ শতাংশেরই ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। বিপরীতে ৫০ বছর বা এর বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ৪৫ শতাংশ।

রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক পার্থক্য

অনেক দেশেই রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী ও ডানপন্থী মতাদর্শের মানুষের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির বিশাল ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির ৮৩ শতাংশ উদারপন্থী ও ৩৭ শতাংশ রক্ষণশীল মানুষের চোখে ইসরায়েল একটি নেতিবাচক দেশ।

অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইডেনে বামপন্থীদের প্রতি ১০ জনের প্রায় ৯ জন বা এর চেয়ে বেশি মানুষের মনোভাব ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক। দেশগুলোর প্রতিটিতেই বামপন্থীদের এই হার ডানপন্থীদের তুলনায় অন্তত ২৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

জরিপ করা প্রায় প্রতিটি উচ্চ আয়ের দেশেই রাজনৈতিক আদর্শের এমন ছোট, কিন্তু ধারাবাহিক ব্যবধান দেখা গেছে। সবখানেই ডানপন্থীদের তুলনায় বামপন্থীরা ইসরায়েল সম্পর্কে বেশি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন ধারাবাহিক চিত্র দেখা যায়নি।

২০২৫ সালের তুলনায় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

গত বছরও (২০২৫) ইসরায়েলের প্রতি সাধারণ মানুষের মনোভাব বেশ নেতিবাচক ছিল। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের কাছে আগের তথ্য রয়েছে, এমন ২৪টি দেশের মধ্যে ১৩টিতেই ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব এখন আরও বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, আর্জেন্টিনায় ২০২৫ সালে ৪৬ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। বর্তমানে তা বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠে রূপ নিয়েছে।

একইভাবে অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলের প্রতি ‘অত্যন্ত নেতিবাচক’ মনোভাব রাখার হার দুই অঙ্কের ঘরে (১০ শতাংশ বা এর বেশি) বেড়েছে।

জরিপ করা দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র গ্রিসেই গত বছরের তুলনায় ইসরায়েলের প্রতি মনোভাব কিছুটা ইতিবাচক বা উষ্ণ হয়েছে। তবে এ পরিবর্তনের পরও দেশটির মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে ইসরায়েল সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন।

নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা

জরিপ করা অধিকাংশ দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের ‘খুব একটা বা একেবারেই’ আস্থা নেই।

এসব দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, স্পেন, সুইডেন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও (ফিলিস্তিনের) পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে।

জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর অর্ধেক বা এর চেয়ে বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের ‘একবিন্দুও আস্থা নেই’।

দেশগুলোর মধ্যে শুধু কেনিয়া ও ফিলিপাইনে অর্ধেকের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন।

ইসরায়েল সম্পর্কে মনোভাবের মতো নেতানিয়াহুর ওপর আস্থার ক্ষেত্রেও বয়স ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা গেছে। তরুণ ও বামপন্থীরা প্রায়ই বয়স্ক ও ডানপন্থীদের তুলনায় তাঁর ওপর কম আস্থা দেখিয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে, হাঙ্গেরিতে ৫০ বছর বা এর বেশি বয়সীদের তুলনায় ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ইসরায়েলি নেতার প্রতি ‘খুব কম বা কোনো আস্থা নেই’ বলার প্রবণতা ২৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

আবার অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থীদের মধ্যে নেতানিয়াহুর ওপর ‘একবিন্দু আস্থা নেই’ বলার হার ডানপন্থীদের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। রাজনৈতিক আদর্শগত এ ব্যবধান যথারীতি যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

গত বছরের তুলনায় নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থার পরিবর্তন

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পিউ রিসার্চ সেন্টারের কাছে আগের তথ্য রয়েছে, এমন ২৪টি দেশের ১৩টিতেই ২০২৫ সালের তুলনায় নেতানিয়াহুর ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার ৭৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখন বলেছেন, বিশ্বরাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের ‘খুব একটা বা একেবারেই’ আস্থা নেই। গত বছর এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ।

গত বছর একই প্রশ্ন করা হয়েছিল, এমন দেশগুলোর প্রায় অর্ধেকেই নেতানিয়াহুর ওপর ‘একবিন্দু আস্থা নেই’ বলা মানুষের হার দুই অঙ্কের ঘরে (১০ শতাংশ বা এর বেশি) বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইতালিতে ২০২৫ সালে ৪৫ শতাংশ মানুষ এমন মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে।

উল্লেখ্য, ৩৬টি দেশের ৪৪ হাজার ৬৫৭ জনের ওপর এ জরিপ পরিচালিত হয়েছে।

ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু প্রশ্নে ব্যতিক্রম ভারত

এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো ভারত। জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ভারতে মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, আর ৩২ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে জরিপে অংশ নেওয়া সব দেশের মধ্যে ভারতেই ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে কম নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।

নেতানিয়াহুর প্রতি অনাস্থা প্রশ্নেও ভারত ব্যতিক্রমী অবস্থানে। দেশটির মাত্র ২৭ শতাংশ মানুষ নেতানিয়াহুর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন, আর ৩৪ শতাংশ আস্থা রাখেন বলে জানিয়েছেন।

(ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের হার)

তুরস্ক–৯৭ শতাংশ

পাকিস্তান–৯৫ শতাংশ

মালয়েশিয়া–৮৯ শতাংশ

ইন্দোনেশিয়া–৮৬ শতাংশ

পশ্চিম তীর/পূর্ব জেরুজালেম–৮৫ শতাংশ

জাপান–৮৩ শতাংশ

অস্ট্রেলিয়া–৭৯ শতাংশ

বাংলাদেশ–৭৯ শতাংশ

নেদারল্যান্ডস–৭৬ শতাংশ

স্পেন–৭৮ শতাংশ

সুইডেন–৭৮ শতাংশ

ইতালি–৭৫ শতাংশ

জার্মানি–৭৩ শতাংশ

সিঙ্গাপুর–৭২ শতাংশ

পোল্যান্ড–৭০ শতাংশ

দক্ষিণ কোরিয়া–৭০ শতাংশ

যুক্তরাজ্য–৬৯ শতাংশ

ফ্রান্স–৬৮ শতাংশ

কানাডা–৬৫ শতাংশ

গ্রিস–৬৫ শতাংশ

ফিলিপাইন–৬৪ শতাংশ

যুক্তরাষ্ট্র–৬০ শতাংশ

চিলি–৬০ শতাংশ

থাইল্যান্ড–৫৯ শতাংশ

মেক্সিকো–৫৯ শতাংশ

দক্ষিণ আফ্রিকা–৫৮ শতাংশ

কলম্বিয়া–৫৬ শতাংশ

আর্জেন্টিনা–৫৫ শতাংশ

হাঙ্গেরি–৫৪ শতাংশ

ব্রাজিল–৫২ শতাংশ

পেরু–৫০ শতাংশ

কেনিয়া–৪৭ শতাংশ

শ্রীলঙ্কা–৪১ শতাংশ

নাইজেরিয়া–৪১ শতাংশ

ঘানা–৩৬ শতাংশ

ভারত–২৮ শতাংশ

(নেতানিয়াহুর ওপর অনাস্থার হার)

তুরস্ক–৯৫ শতাংশ

পাকিস্তান–৯২ শতাংশ

মালয়েশিয়া–৯১ শতাংশ

বাংলাদেশ–৯০ শতাংশ

ইন্দোনেশিয়া–৮৯ শতাংশ

পশ্চিম তীর/পূর্ব জেরুজালেম–৮৮ শতাংশ

জাপান–৮৭ শতাংশ

অস্ট্রেলিয়া–৮৪ শতাংশ

স্পেন–৮৪ শতাংশ

সুইডেন–৮৪ শতাংশ

নেদারল্যান্ডস–৮৩ শতাংশ

ইতালি–৮৩ শতাংশ

জার্মানি–৭৯ শতাংশ

সিঙ্গাপুর–৭৮ শতাংশ

দক্ষিণ কোরিয়া–৭৬ শতাংশ

পোল্যান্ড–৭৫ শতাংশ

যুক্তরাজ্য–৭৪ শতাংশ

ফ্রান্স–৭৩ শতাংশ

কানাডা–৭০ শতাংশ

গ্রিস–৬৯ শতাংশ

চিলি–৬৮ শতাংশ

ফ্রান্স–৬৮ শতাংশ

থাইল্যান্ড–৬৭ শতাংশ

মেক্সিকো–৬৬ শতাংশ

যুক্তরাষ্ট্র–৬৫ শতাংশ

দক্ষিণ আফ্রিকা–৬৪ শতাংশ

কলম্বিয়া–৬৩ শতাংশ

আর্জেন্টিনা–৬২ শতাংশ

হাঙ্গেরি–৬০ শতাংশ

ব্রাজিল–৫৯ শতাংশ

পেরু–৫৭ শতাংশ

ফিলিপাইন–৪৬ শতাংশ

শ্রীলঙ্কা–৪৩ শতাংশ

নাইজেরিয়া–৪১ শতাংশ

ঘানা–৩৪ শতাংশ

কেনিয়া–২৮ শতাংশ

ভারত–২৭ শতাংশ

(উৎস: পিউ রিসার্চ সেন্টার জরিপ, ২০২৬)