বাংলাদেশ

জাহাজটিকে ‘নিরাপদ সনদ’ দেয় ৬ সংস্থা

August 17, 2026
1 day ago
By SAJ
জাহাজটিকে ‘নিরাপদ সনদ’ দেয় ৬ সংস্থা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যে জাহাজ থেকে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, সেটিকে ভাঙার জন্য নিরাপদ হিসেবে সনদ দিয়েছে সরকারি চারটি সংস্থা ও সরকার নিয়োজিত বেসরকারি একটি সেফটি এজেন্সি। এর বাইরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের (বিএসআরবি) অনুমোদনও ছিল।

গত বছরের ১১ জুলাই এমটি রাসি নামের প্রায় ৯৪ হাজার টন ওজনের জাহাজটি পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, চট্টগ্রাম ও বেসরকারি শিপ স্ট্রিপের প্রতিনিধিরা। এর পরের মাসে সেটিকে নিরাপদ হিসেবে ভাঙার সনদ দেওয়া হয়। জাহাজটি কীভাবে ভাঙা হবে, তার নকশা করে দেয় শিপ স্ট্রিপ।

১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক মারা যান। তাঁদের মৃত্যুর কারণ হাইড্রোজেন সালফাইড বলে জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। হাইড্রোজেন সালফাইড বর্ণহীন, বিষাক্ত ও জ্বলনশীল গ্যাস। তবে গত বছরের পরিদর্শন প্রতিবেদনে জাহাজটিতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এমন পদার্থের কথা উল্লেখ নেই। বিপজ্জনক পদার্থের কথা উল্লেখ ছিল না জাহাজ আমদানির সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আইএইচএম (জাহাজের কাঠামোয় থাকা বিপজ্জনক পদার্থ) তালিকাতেও।

প্রতিবেদনে স্লাজ অয়েল (তেলের ট্যাংকের নিচে জমে থাকা বর্জ্য), লুব অয়েল (ইঞ্জিনের তেল), গ্লাসউল, এসবেস্টস, পেইন্টসহ ১৬ ধরনের পদার্থের উল্লেখ আছে। এ ছাড়া জাহাজটির মালিকপক্ষের দেওয়া ইনভেন্টরি অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালসের (জাহাজে বিভিন্ন অংশে থাকা বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা) তালিকায়ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক কোনো পদার্থের উল্লেখ ছিল না। আইএইচএমের তালিকাটিও যাচাই-বাছাই করা হয়েছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৩৭ শ্রমিকের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মারা গেছেন তিনজন। আর সর্বশষে ১৪ আগস্টের নয়জনের মৃত্যু যোগ করলে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৯–এ।

বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজভাঙার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা–২০১১–এর ১৯(৪) অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট সরকার ৯ সদস্যের একটি কমিটি পুনর্গঠন করে। ওই কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত ও পরিবেশ রসায়ন বিভাগ, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, চিটাগাং ড্রাই ডক, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের সদস্য করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এ কমিটি মূলত জাহাজের বাহ্যিক কাঠামো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেয়। এখানে পরিবেশ অধিদপ্তর জাহাজের তেল পৃথক্‌করণব্যবস্থা, জমে থাকা তেলের গাদ ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, যাতে এগুলো সমুদ্রে না যায়—এসব বিষয় দেখে থাকে। বিষাক্ত পদার্থ বা গ্যাস আছে কি না, সেটা দেখে বিস্ফোরক অধিদপ্তর।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম সাখাওয়াত হোসেন ওই জাহাজ পরিদর্শক দলের সদস্য ছিলেন। গত শনিবার ও গতকাল রোববার পরপর দুই দিন যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তাঁর মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক তোফাজ্জেল হোসাইন দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস ফ্রি যে সনদ, সেটা এক বছর আগের। আমরা পেট্রোলিয়াম বিধিমালা অনুযায়ী জাহাজের পেট্রোলিয়াম–জাতীয় কোনো গ্যাস বা পদার্থের উপস্থিতি আছে কি না, সেটি দেখি।’ তোফাজ্জেল হোসাইন বলেন, ‘পরিদর্শনে আমরা হাউড্রোজেন সালফাইডের অস্তিত্ব পাইনি এবং পেট্রোলিয়াম–জাতীয় পদার্থ যে ধরনের ট্যাংকারে থাকে, সেখান থেকে দুর্ঘটনা ঘটেনি।’

পরিদর্শক দলের সদস্য ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন উপসহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি এখন রাজশাহীতে কর্মরত। শনিবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখি আগুন নির্বাপণব্যবস্থা ঠিকমতো আছে কি না, জাহাজে কর্মরত ব্যক্তিদের আগুন নির্বাপণের প্রশিক্ষণ আছে কি না এবং আগুন নির্বাপণের জন্য যথাযথ সরঞ্জাম সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না।’

পরিদর্শক দলের অন্য দুই সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে জাহাজটিকে নিরাপত্তা সনদ দেওয়া হলেও পরিদর্শনে গিয়ে ঝুঁকি বিবেচনায় জাহাজটির ডেক থেকে ভেতরে থাকা কফারড্যাম (একটি ট্যাংকের গ্যাস অন্য ট্যাংকে যাতে যেতে না পারে, সে জন্য রাখা ফাঁকা জায়গা) এলাকায় নামেনি পরিদর্শক দল। জাহাজের ডেক থেকে রিফ্লেক্টর (দূর থেকে ভেতরে দেখার জন্য আয়নাজাতীয় বস্তু) দিয়ে ট্যাংকগুলো দেখে নিরাপত্তা সনদ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জাহাজে ৪টি মেমব্রেন ট্যাংক (ভেতরে গ্যাস রাখার বিশেষ ধরনের ট্যাংক) ছিল। সেগুলোও দূর থেকে পরিদর্শন করা হয়েছে।

পরিদর্শক দলের সঙ্গে যাওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, পরিদর্শন মূলত হয় জাহাজের ডেক থেকে। কেউ জাহাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চায় না। একেকটা জাহাজের উচ্চতা হয় ৫ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত। জাহাজের ওপর থেকে সর্বোচ্চ একতলা বা দুইতলা সমান এলাকা পরিদর্শন করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিদর্শক দলের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে বাহ্যিক দৃশ্যমান বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজের ভেতরে ও কাঠামোয় নানা ধরনের মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত পদার্থ বা গ্যাস থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। জাহাজভাঙার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার এসব গ্যাস শনাক্ত করার মতো সরঞ্জাম নেই।

এমটি রাসি জাহাজটির মালিকের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া আইএইচএম তালিকাতেও কোনো বিষাক্ত গ্যাসের কথা উল্লেখ ছিল না। তবে তালিকায় শতাধিক রাসায়নিক পদার্থের উল্লেখ আছে।

প্রতিটি জাহাজ ভাঙার আগে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের কাছে জাহাজভাঙার পরিকল্পনা জমা দিতে হয়। এরপর বোর্ড নিরাপদ, পরিবেশসম্মতভাবে জাহাজ কাটা, বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশন মেনে জাহাজ কাটার অনুমোদন দেয়।

বিভিন্ন সংস্থা ও বোর্ডের কয়েক ধাপে এসব পরীক্ষা–নিরীক্ষা করার পরও কীভাবে একটি জাহাজে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন প্রশ্নে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, একটি জাহাজ সম্পূর্ণ না ভাঙা পর্যন্ত এর বিশাল কাঠামোর কোথায় কী বিষাক্ত পদার্থ আছে, তা জানা যায় না। কয়েক ধাপে পরীক্ষা–নিরীক্ষা সত্ত্বেও ঝুঁকি থেকে যায়। এ কারণে তাঁরা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা সব সময় বলেন।

ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল উল্লেখ করে শফিউল আলম বলেন, জাহাজের যে অংশে কাজ চলছিল, সেখানে প্রবেশের আগে গ্যাস ডিটেক্টর (গ্যাস শনাক্ত করার যন্ত্র) দিয়ে আগে পরীক্ষা করার কথা। তারা সেটা করেনি।

জাহাজটি আমদানি করার সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ে দেওয়া নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, এটি নির্মাণ করা হয় ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায়। জাহাজটির মূল নাম এইচএস রাস লাফফান। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এমভি রাসি।

নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত জাহাজভাঙা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ২৬ জুন কার্যকর হয় হংকং কনভেনশন। এই কনভেনশন অনুযায়ী, জাহাজ রপ্তানিকারক আমদানিকারককে অবশ্যই জাহাজের আইএইচএম তালিকা দেবে। এমভি রাসির আইএইচএম তৈরি করেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেটিজফট এশিয়া পিটিই লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আইএইচএম তৈরি করা হয়েছিল মূলত সরেজমিন পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং জাহাজটি সম্পর্কে জানেন—এমন ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।

মেটিজফটের কথা আইএইচএমে বলা হয়েছে, জাহাজের বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে সব স্থান ও যন্ত্রপাতি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং তার গ্রাহকের তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে এবং সেসব তথ্য সঠিক বলে ধরে নিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারা বলছে, প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য নির্ভরযোগ্য ও সঠিক। তবে প্রতিষ্ঠানটি এসব তথ্যের নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিবেদনের পুরো বা কোনো অংশের তথ্য সরবরাহ বা ব্যবহারের কারণে ক্লায়েন্টের কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তারা দায়ী থাকবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশ জাহাজভাঙায় শীর্ষ অবস্থানে ছিল। ২০২৩ সালে সারা বিশ্বের ৪৪৬টি পরিত্যক্ত জাহাজের ১৭০টি ভাঙা হয় বাংলাদেশে, শতাংশের হিসাবে যা ৩৮.১২। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ভাঙা হয়েছে ১৩০টি আর ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৮।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা ও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, জাহাজের প্রকৃত মালিকানা লুকিয়ে কিছু কোম্পানি ফ্ল্যাগ পরিবর্তন করে এসব জাহাজ কিনে নেয় এবং বাংলাদেশের ইয়ার্ডে বিক্রি করে। এদের বলা হয় ‘ক্যাশ বায়ার’। তারা আইএইচএমসদৃশ একটা নথি জমা দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ে, যাতে বর্জ্যসংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য থাকে না।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, আইএইচএমের উদ্দেশ্যই হলো জাহাজের ইন–বিল্ট (জাহাজের কাঠামো) যে বর্জ্য থাকে, সেটার প্রকৃত চিত্র দেওয়া। আইএইচএম তালিকা যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই–বাছাইয়ে আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও শিল্প মন্ত্রণালয় অসত্য তথ্যসংবলিত তালিকা গ্রহণ করে এবং জাহাজ আমদানির অনুমোদন দেয়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে আর শ্রমিকেরা প্রাণ হারান।