জিজ্ঞাসাবাদে এক-এগারোর নেপথ্যের অনেকের নাম
মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদে এক–এগারোর নেপথ্যের কুশীলব হিসেবে তৎকালীন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ইতিমধ্যে এসব ব্যক্তির একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে যাঁরা দেশে অবস্থান করছেন, তাঁদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরও জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে তৎকালীন তিন বাহিনীর প্রধানেরা ছাড়াও সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের আরও কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা রয়েছেন, যাঁরা ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সরিয়ে সেনা–সমর্থিত এক–এগারোর সরকার গঠনের নেপথ্যে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন তাঁদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে।
গোয়েন্দা সূত্র আরও বলছে, এক-এগারোর সময় যাঁরা নেপথ্যে থেকে সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের ভূমিকা, আর্থিক লেনদেন ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এখন নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের ভিত্তিতে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এক–এগারোর অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাঁকে পল্টন থানার মানব পাচারসংক্রান্ত একটি মামলায় গত মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিবি হেফাজতে থাকা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে এক-এগারোর সময় তাঁর প্রভাবশালী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সুবিধাভোগের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে। তিনি কিছু বিষয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন এবং কিছু বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই–বাছাই করতে হচ্ছে। ফলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার (সাইবার) সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, তদন্ত চলছে। এখনো বিষয়গুলো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা, মানি লন্ডারিং, মানব পাচার, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১১টি মামলার তথ্য পেয়েছে ডিবি। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তের উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকেও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে ফল ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় বৃহস্পতিবার আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিবি হেফাজতে গতকাল শুক্রবার ছিল তাঁর রিমান্ডের প্রথম দিন।
শেখ মামুন খালেদকে গত বুধবার রাতে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে আটক করে (ডিবি)। তিনি ২০০৭–০৮ সালে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে ছিলেন। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, শেখ মামুন খালেদকে এখন পর্যন্ত মামলার বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধ করার সক্ষমতা তাঁর ছিল। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে এসেছে, সব বিষয়েই পর্যায়ক্রমে জানতে চাওয়া হবে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।