বাংলাদেশ

জ্বালানি তেল আমদানির উৎস বাড়াতে চায় সরকার

March 11, 2026
1 month ago
By SAJ
জ্বালানি তেল আমদানির উৎস বাড়াতে চায় সরকার

মার্চে জ্বালানি তেলের সংকট হবে না বলে মনে করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি ব্যাহত হতে পারে, পিছিয়ে যেতে পারে জাহাজ আসার সময়। কেউ কেউ সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে চাহিদামতো জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করতে চুক্তির বাইরে নতুন উৎস খুঁজছে সরকার। ভারত থেকেও বাড়তি আমদানির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের সূত্র বলছে, জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি কেনার চুক্তি করা আছে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহকারীরা তেল পরিশোধন করতে সংকটে পড়বে। সে ক্ষেত্রে আগামী মে মাসে তারা চুক্তি অনুসারে তেল সরবরাহে ব্যর্থ হতে পারে। তাই সরকারি পর্যায়ে জিটুজি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বা সরাসরি প্রক্রিয়ায় তেল কেনার চিন্তা করা হচ্ছে।

জ্বালানি তেল আমদানির কাজটি করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির সূত্র বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ১৫টি জাহাজ আসে জ্বালানি তেল নিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি তেল আসছে না। এ মাসে জ্বালানি তেল নিয়ে মোট ১৬টি জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬টি জাহাজ এসেছে। ১৩ মার্চের মধ্যে আরও তিনটি আসার কথা রয়েছে। এরপর ৩১ মার্চের মধ্যে ৭টি জাহাজ আসার কথা নিশ্চিত করেছে সরবরাহকারীরা। পেছানো বা সরবরাহে অপারগতার কথা জানায়নি কেউ। তবে গতকাল পর্যন্ত জাহাজ আসার সময়সূচি নিশ্চিত করেনি তারা।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ পরিবহন হয় ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। তবে এ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের বেশির ভাগ জাহাজ আসে। যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পর এটি বন্ধ করে দেয় ইরান। ঝুঁকি থাকায় দিনে কয়েকটির বেশি জাহাজ পার হচ্ছে না এখন। বাংলাদেশের পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে পার হতে দিতে ইরানকে অনুরোধ করেছে সরকার। ইরান সরকার আশ্বস্ত করেছে, বাধা দেওয়া হবে না। এতে করে এ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন করা গেলে সরবরাহ বাড়তে পারে।

আতঙ্কে জ্বালানি তেল বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় গত শনিবার থেকে ফিলিং স্টেশনে ২৫ শতাংশ করে সরবরাহ কমানো হয়েছে। পাশাপাশি এর আগের দিন থেকে সরকার নির্ধারিত সীমা মেনে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। গতকাল রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫ লিটার তেল সরবরাহের সীমা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ বুধবার থেকে গাড়িতেও তেল সরবরাহের সীমা কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। এ ছাড়া কূটনৈতিকদের গাড়িতে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে সীমা তুলে দেওয়া হতে পারে। গতকাল পেট্রল ও অকটেন সরবরাহের সীমা তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিপিসিকে চিঠি দিয়েছে পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, মার্চে কোনো সরবরাহ সংকট নেই। এপ্রিল ও মে মাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিকল্প উৎস হিসেবে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির বিষয়েও কাজ চলছে। বাংলাদেশে তেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আনতে দেশটির নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর চুক্তি করে বিপিসি। চুক্তি অনুসারে, এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। এর বাইরে আরও অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন দেওয়ার কথা, যদিও তা বাধ্যতামূলক নয়। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নিশ্চিত ৬০ হাজার ও অতিরিক্ত ৩০ হাজার টন আসার কথা। প্রতিবার ৫ হাজার টন করে ডিজেল পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। কেননা, তেল পাইপলাইন থেকে খালাসের মজুতাগারের সক্ষমতা এটুকুই। মজুত শেষ করার আগে চাইলেও বাড়তি আনা যায় না।

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে। জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে ভারত থেকে পাইপলাইনে তেল আনতে প্রতি ব্যারেলের (১৫৯ লিটার) পরিবহন খরচ সাড়ে ৫ ডলার। এ বছর গতকাল পর্যন্ত পাইপলাইনে দুটি চালানে ১০ হাজার টন ডিজেল এসেছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থা ইন্ডিয়ার অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (আইওসিএল) থেকেও তেল আমদানি করে বিপিসি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৫ হাজার টন তেল আসার কথা। এর মধ্যে ডিজেল ২০ হাজার টন, ফার্নেস ৫০ হাজার টন, অকটেন ২৫ হাজার টন ও জেট ফুয়েল ১০ হাজার টন। সমুদ্রপথে এ জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আইওসিএল।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে ৮ মার্চ জ্বালানি বিভাগের কাছে ভারত থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠায় বিপিসি। এতে বলা হয়, পাইপলাইনে মার্চে ৪ ধাপে ২০ হাজার ও এপ্রিলে ৫ ধাপে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব করা যেতে পারে। পরবর্তী মাসগুলোতেও একই হারে আনা যায়। এ ছাড়া দূরত্ব বিবেচনায় ভারত থেকে সমুদ্রপথে ৩০ হাজার টন করে চারটি জাহাজে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা যেতে পারে।

পেট্রল শতভাগ দেশে উৎপাদন হয়। অকটেনের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। তাই চিন্তা মূলত ডিজেল নিয়ে। বছরে বিপিসির সরবরাহ করা জ্বালানির ৭০ শতাংশ ডিজেল। শিল্প কারখানা, কৃষি, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। তাই ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম ছিল ৮৮ ডলার। এটি ১৪৬ ডলারে পৌঁছায় গত রোববার। সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয় এবং তুলনামূলক কম দামে ডিজেল আমদানি করতে বিকল্প উৎস বিবেচনা করা হচ্ছে।

চুক্তি অনুসারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। এ জ্বালানি শোধন করে গত অর্থবছর ৭ লাখ ৩২ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ সরবরাহ বন্ধ আছে। বর্তমান মজুত দিয়ে আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত তেল পরিশোধন করতে পারবে ইআরএল। আর পরিশোধিত তেল আসে সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আরব আমিরাত, কুয়েত, থাইল্যান্ড, ওমান ও ভারত থেকে। এখন এদের পাশাপাশি বিকল্প উৎস সন্ধান করা হচ্ছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি নামের একটি কোম্পানি দুই লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসির কাছে। তারা জাহাজভাড়াসহ প্রতি ব্যারেল ৭৬ ডলারে ডিজেল দিতে চায়। তবে তাদের তেল সরবরাহের সক্ষমতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাজারদরের অর্ধেক দামে এমন সরবরাহের প্রস্তাব নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কাজাখস্তান থেকে এ তেল সরবরাহ করা হতে পারে বলে মনে করছে বিপিসি।

এদিকে বাজার দামে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি পেট্রো গ্যাস এলএলপি। মূলত তেল চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের দিন ও তার আগে–পরে দুই দিনসহ মোট পাঁচ দিনের আন্তর্জাতিক দর গড় করে বিল হিসাব করা হয়। তবে তারা পরিবহন খরচ চেয়েছে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৪৫ ডলার। বর্তমানে জুন পর্যন্ত করা চুক্তির অধীনে ৫ দশমিক ৩৩ ডলার পরিবহন খরচ হয় বিপিসির।

জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দুটি প্রস্তাবের দামে অনেক পার্থক্য। আরও অনেকেই প্রস্তাব নিয়ে আসছে। এগুলো যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। সরবরাহের সক্ষমতা, গুণগত মান, তেলের দাম—সবকিছু পর্যালোচনা করেই কোম্পানি বাছাই করা হবে। বিশেষ বিবেচনায় দরপত্র ছাড়াও সরাসরি জ্বালানি তেল কেনার অনুমোদন দিতে পারে সরকার।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা করা উচিত। দাম বেশি হলেও দেশের প্রয়োজনে সেরা উৎস খুঁজে বের করতে হবে। কম দামে পেলে খুবই ভালো, তবে নিম্নমানের তেল কেনা যাবে না। ভারত থেকে আমদানি বাড়ানো গেলে খরচ কম হবে।