খেলা

কে এই আর্জেন্টাইন ‘পাগলা’ কোচ

June 26, 2026
3 months ago
By SAJ
কে এই আর্জেন্টাইন ‘পাগলা’ কোচ

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম ততক্ষণে হলুদ সমুদ্রে পরিণত হয়েছে। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইকুয়েডর যখন ইতিহাস গড়ল, সবার নজর তখন ডাগআউটের ছটফটে এক ব্যক্তির দিকে। লম্বা এলোমেলো চুলে তাঁকে কোচের চেয়ে কোনো রক ব্যান্ডের গিটারিস্ট মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তিনি ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাচেচে।

কয়েক দিন আগেও এই স্টেডিয়ামে সমর্থকদের দুয়োধ্বনি শুনেছিলেন এই আর্জেন্টাইন। আইভরিকোস্টের কাছে হার আর কুরাসাওয়ের সঙ্গে ড্রয়ের পর বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি হয়তো সমর্থকদের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারিনি।’ সেই বেকাচেচেই এখন ইকুয়েডরের রূপকথার নায়ক।

আর্জেন্টাইন এই কোচের ফুটবল দর্শনের দুই গুরু—কিংবদন্তি মার্সেলো বিয়েলসা ও হোর্হে সাম্পাওলি। বিয়েলসার প্রতি ভক্তি এতটাই যে নিজের শরীরে তাঁর ট্যাটুও করিয়েছেন।

বেকাচেচের কোচিং মানেই একটি আধুনিক গবেষণাগার। তিনি নিজেকে ‘স্বশিক্ষিত’ কোচ বলেন। ভিডিও অ্যানালিটিকস থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবকিছু ব্যবহার করে তিনি প্রতিপক্ষকে ব্যবচ্ছেদ করেন। ডাগআউটে সারাক্ষণ নোটবুক আর আইপ্যাড নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তিনি। পুরোনো ডায়েরি ঘেঁটে সাজান বর্তমানের কৌশল। এই প্রযুক্তিনির্ভরতাই তাঁকে আধুনিক ফুটবলে আলাদা করে চিনিয়েছে।

৯০ মিনিটের ম্যাচে বেকাচেচে এক মুহূর্তও স্থির থাকেন না। টাচলাইনের ধারে তাঁর অনবরত পায়চারি আর চিৎকার দেখে দর্শকেরা রসিকতা করে বলেন, তিনিই দলের ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’। তিনি যেভাবে মাঠের এপাশ-ওপাশ দৌড়ান কিংবা লাফান, তাতে মনে হয় তিনি নিজেই বুঝি মাঠে নেমে পড়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বেকাচেচের এই ‘অশান্ত’ লড়াকু উপস্থিতিই খেলোয়াড়দের মনে বাড়তি জেদ তৈরি করে। জার্মানির বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও যে জয়, তাকে ফুটবল মহলের অনেকে বেকাচেচের কৌশলী পরিবর্তন আর ডাগআউটের তেজেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। আবেগ আর প্রযুক্তির সঠিক মিশেল যেন একেই বলে।

বেকাচেচের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ বিশ্বকাপের আগে। তখন তিনি আর্জেন্টিনা দলে সাম্পাওলির সহকারী। ম্যানচেস্টারে অনুশীলনের এক পর্যায়ে মেসির একটি ভুল শুধরে দিতে গিয়ে কাঁধে হাত দিয়ে কিছু একটা বলছিলেন তিনি।

আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ‘ক্লারিন’-এর দাবি, বেকাচেচের কথা নয়, বরং ‘কাঁধে হাত দেওয়ার’ ভঙ্গিটি পছন্দ হয়নি মেসির। মেসি তৎক্ষণাৎ সাম্পাওলিকে জানিয়ে দেন, ‘এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে।’ সেই তিক্ত সম্পর্ক অবশ্য এখন ‘সুন্দর’ বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছে। এখন অকপটে মেসির স্তুতি করেন বেকাচেচে। এমনকি জানিয়েছেন, মেসির ক্যারিয়ার ও জীবন থেকে তিনি শিখেছেন অনেক কিছু।

বেকাচেচের জীবন যেন সিনেমা। রোজারিওতে জন্ম নেওয়া এই কোচের ফুটবলার হওয়ার শখ থাকলেও প্রতিভা এত ছিল না। কিন্তু নেশা কাটেনি। কোচিং শিখতে ইন্টারনেটে পড়াশোনা করতেন। সেই খরচ জোগাতে রাস্তায় হকার হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। বেকাচেচে বিশ্বকাপের এমন এক বিরল কোচ, যাঁর কোনো পেশাদার ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা নেই।

জার্মানিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ার পর বেকাচেচে সমর্থকদের বলেছেন, ‘এই জয় ইকুয়েডরের মানুষের।’ তাঁর অধীনে দলটি এখন হাই-প্রেসিং ও দ্রুতগতির ফুটবল খেলছে। পেশাদার ফুটবলার হতে না পারা সেই ‘হকার’ আজ বিশ্বফুটবলের এক আলোচিত নাম।