খুঁটিতে বাঁধা বাবার মুখে পাউরুটি তুলে দেওয়া ছোট্ট মেয়েটিকে স্কুলে নিয়ে গেলেন ইউএনও
চুরির অভিযোগে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা বাবার মুখে পাউরুটি তুলে দেওয়া ছোট্ট মেয়েটি বিদ্যালয়ে ফিরেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান বরিশালের উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে ফিরতে পেরে মেয়েটি ভীষণ খুশি।
স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়েটি। এ সময় তার মা পাশে ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক, সহপাঠী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ইউএনও মো. আলী সুজা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মেয়েটির সহপাঠীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মেয়েটি যাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য সবার সহযোগিতা চান ইউএনও।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘আমরা মেয়েটিকে সাদর গ্রহণ করেছি। বাবার সঙ্গে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর থেকে ও আর বিদ্যালয়ে আসছিল না। সে খুবই মেধাবী। সে যাতে তার পড়াশোনা স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর মেয়েটির বাবাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বরিশাল নগরের একটি মাদকসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠায় উপজেলা প্রশাসন। সেখানে তাঁকে তিন মাস রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আজ দুপুরে ইউএনও মো. আলী সুজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পরিবারটির সুরক্ষার পাশাপাশি পুনর্বাসন এবং মেয়েটির পড়াশোনা নিশ্চিত করার ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ নেব। এ জন্য পরিবারটিকে সুরক্ষা দিতে প্রথমে ওই ব্যক্তিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। সে জন্য আমরা তাঁকে একটি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। তিন মাস তিনি সেখানে থাকবেন। এর ব্যয়ভার আমরা বহন করব। আজ মেয়েটিকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হলো।’
ওই ব্যক্তির স্ত্রীর জন্যও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও। তিনি বলেন, বাবা-মেয়ের ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের অনেকেই পরিবারটিকে সাহায্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আর্থিক সহায়তা ও উপজেলা প্রশাসনের আর্থিক সহায়তা মিলিয়ে মেয়েটির পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচের ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য মেয়েটির মায়ের নামে একটি স্থায়ী আমানত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেয়েটির বাবা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে তাঁর জন্যও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আলী সুজা বলেন, ‘আমরা সমাজের সব অসঙ্গতি হয়তো দূর করতে পারব না। কিন্তু একটি পরিবারকে সুরক্ষা দিয়ে অন্তত সমাজে একটি মডেল তৈরি করতে পারি। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। আশা করি, আমরা তা পারব।’
গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে উজিরপুরের একটি বাজারে চুরির অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী। পরদিন শনিবার সকালে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় তাঁর ৯ বছর বয়সী মেয়ে। বাবাকে আর মারধর না করার জন্য সে উপস্থিত লোকজনের কাছে আকুতি জানায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি খুঁটির সঙ্গে ওই ব্যক্তির পা বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁর হাতে একটি চায়ের কাপ। মেয়েটি পাউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বিভিন্ন কথা বলছেন। বাবার মুখে রুটি তুলে দিতে দিতে মেয়েটি অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল লোকজনের দিকে।
বিষয়টি নিয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি শিশুটির পাশে দাঁড়াতে এবং পরিবারটিকে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরিবারের পাশা দাঁড়ানোয় ইউএনওর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেয়েটির মা বলেন, ‘ইউএনও স্যার আমাদের পরিবারের দুঃসময়ে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ। তিনি এমন উদ্যোগ না নিলে আমার পরিবার ধ্বংস হয়ে যেত। মেয়ের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যেত।’