‘কইতাছে আইসিইউ লাগব, কাছে তো এক টেহাও নাই’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিচতলায় ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ঢুকতেই চোখ আটকে যায় ৭ নম্বর শয্যায়। সেখানে শুয়ে আছে ১৮ মাস বয়সী সাইদুর। ছোট্ট হাতে ক্যানুলা, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, নাকে খাবার দেওয়ার নল। আধখোলা চোখে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকা শিশুটিকে দেখে বোঝার উপায় নেই, কয়েক দিন আগেও সে ছিল পরিবারের সবার আদরের ছোট সন্তান।
শরীরজুড়ে হামের র্যাশ, অনেক জায়গায় রং গাঢ় হয়ে গেছে, হাতে, পায়ের কোথাও কোথাও চামড়া উঠে গেছে ছোট্ট সাইদুরের। তিন দিন আগে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শিশু সাইদুরকে।
সাইদুরের বিছানার পাশে বসে আছেন বাবা শাহীনুর আলী ও মা সফিনা। দুজনের চোখেই উৎকণ্ঠা। কথা বলতে বলতে বারবার ছেলের দিকে তাকাচ্ছিলেন শাহীনুর। নিচু স্বরে বললেন, ‘ছেলাটার অবস্থা এইডা। এখন কইতাছে আইসিইউ লাগব। আইসিইউ তো অনেক টেহা।’
কর্তব্যরত একজন নার্স বললেন, সাইদুরের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) প্রয়োজন। কিন্তু আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই। অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম উঠেছে। এই হাসপাতালের আইসিইউতে প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টাকা খরচ হয়।
নার্সের কথা শুনে শাহীনুর যেন আরও গুটিয়ে গেলেন। পকেট থেকে ঘামে ভেজা কয়েকটি ১০০ ও ৫০ টাকার নোট বের করে দেখিয়ে বললেন, ‘আমার কাছে তো এক টেহাও নাই।’
শাহীনুর ও সফিনা দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সাইদুর সবার ছোট। বড় মেয়েটি শারীরিক প্রতিবন্ধী। এর মধ্যেই দুই মাস আগে ধরা পড়ে সাইদুরের হৃদ্যন্ত্রে জন্মগত ছিদ্র। মাছের ব্যবসা করে সংসার চালানো শাহীনুর ছেলের চিকিৎসার টাকা জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তার মধ্যেই হামের সংক্রমণ এসে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাইদুরের মা সফিনা বলেন, ‘ঈদের পরদিন কোনো গাড়ি পাই নাই। পরে বাধ্য অইয়া ছুডো গাড়ি ভাড়া কইরা আনতে হইছে। তাতেই ১০ হাজার টেকা খরচ অইছে। আগে হৃদ্রোগ হাসপাতালে নিছি, পরে ওখান থেইকা শিশু হাসপাতালে আনছি।’
ওয়ার্ডজুড়ে একই উদ্বেগ
আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শিশু হাসপাতালের নিচতলার ২, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, তিনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে ৮২ শিশু। ২ নম্বর ওয়ার্ডের সঙ্গেই আইসিইউ। সেখানে ভর্তি আছে ১৪ শিশু।
ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ভর্তি থাকা বেশির ভাগ শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে। কারও শ্বাসকষ্ট, কারও তীব্র জ্বর, কারও নিউমোনিয়ার উপসর্গ আছে।
১৩ শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁদের মধ্যে ১০ জন জানিয়েছেন, তাঁরা হামের টিকা নেননি। দুজন এক ডোজ টিকা নিয়েছে; আর একজন টিকা নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত নন।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন বাবা
বেলা দেড়টার দিকে হাসপাতালের বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এক যুবক। পাশে কয়েকজন স্বজন তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
জানা গেছে, ওই যুবকের নাম রাসেল ইসলাম। গাজীপুরের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাঁর ১১ মাস বয়সী একমাত্র ছেলে রাফসান হামে আক্রান্ত।
রাফসানের দাদি হাসিনা বানু প্রথম আলোকে বলেন, রাসেলের পরিবার বরিশালে থাকে। প্রথমে সেখানকার একটি হাসপাতালে পাঁচ দিন ভর্তি ছিল রাফসান। কিছুটা সুস্থ মনে হওয়ায় বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুদিন পর জ্বর আসায় আবারও ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল সোমবার রাতে তাকে বরিশাল থেকে ঢাকার শিশু হাসপাতালে আনা হয়।
রাসেলের শ্বশুর বলেন, ‘পোলার বাপের তো সামর্থ্য নাই। ১২ হাজার টেকা বেতন। টেকাই কুলাইতে পারতেছে না। কাইলকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া কইরা আইতেই ১৫ হাজার টেকা খরচ হইছে। এহন হেরা কইতেছে, পোলা বাঁচাইতে হইলে আইসিইউতে দেতে হইবো।’
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হামের উপসর্গে গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে আরও ৩ শিশু মারা গেছে। এ সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৭৯ জন।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪৯৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৯০ শিশু। এ নিয়ে মোট ৫৮৮ শিশুর মৃত্যু হলো।