লাক্ষা, কোরাল না চিংড়ি—চট্টগ্রামের বাজারে সবচেয়ে দামি শুঁটকি কোনটি
দোকানে ঢুকতেই একটি বড় শুঁটকি হাতে তুলে ধরলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মনসুর আলম। নাম লাক্ষা। দেখতে অনেকটা কাঠের টুকরার মতো। দাম শুনে চমকে উঠতে হয়। প্রতি কেজি প্রায় ৫ হাজার টাকা। আছাদগঞ্জের বাজারে এটিই এখন সবচেয়ে দামি শুঁটকি। লাক্ষার পাশেই সাজানো কোরাল। একটু দূরে ছুরি। আরেক পাশে চিংড়ি, ফাইস্যা, লইট্টা। আকারে, রঙে, গন্ধে সব আলাদা। দামও আলাদা। কোনোটি কয়েক শ টাকা কেজি। কোনোটি আবার কয়েক হাজার।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আছাদগঞ্জের শুঁটকির বাজারে গিয়ে দেখা গেল এমন দৃশ্য। সরু গলির দুই পাশে সারি সারি দোকান। কোথাও বস্তাভর্তি শুঁটকি। কোথাও শুঁটকি মাটির কলসির ভেতরে। দোকানের সামনে ঝুলছে লইট্টা। বাঁশের ঝুড়িতে সাজানো ছুরি। বাতাসে ভাসছে পরিচিত এক গন্ধ। চট্টগ্রামের আছাদগঞ্জ দেশের অন্যতম বড় শুঁটকি বাণিজ্যকেন্দ্র। কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও পটুয়াখালী থেকে শুঁটকি আসে এখানে। এরপর ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
এখন অবশ্য শুঁটকির ভরা মৌসুম নয়। সাধারণত শীতকালেই সবচেয়ে বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয়। তখন বাজারে পা ফেলার জায়গা থাকে না। কিন্তু মৌসুম না হলেও আছাদগঞ্জে বেচাকেনা থেমে নেই। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে আবারও জমতে শুরু করেছে বাজার।
এখন সবচেয়ে বেশি চলছে চিংড়ি শুঁটকি। চট্টগ্রামের ভাষায় যেটি পরিচিত ‘ইচা’ শুঁটকি নামে। মেসার্স এরফান স্টোরের মালিক মোহাম্মদ মনসুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ভালো মানের ইচা শুঁটকির দাম প্রতি কেজি ২ হাজার ৬০০ টাকা। লইল্যা চিংড়ি ২ হাজার ২০০ টাকা। চাবদা চিংড়ি প্রায় ২ হাজার টাকা। তবে সব চিংড়ি যে দামি, তা নয়। ছোট আকারের কিছু চিংড়ি শুঁটকি এখনো ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়।
মেসার্স এরফান স্টোরে তখন চিংড়ি শুঁটকি কিনতে ব্যস্ত ছিলেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি নিজেও একজন খুচরা বিক্রেতা। নিজের দোকানে বিক্রির জন্য কিনলেন দুই কেজি মাঝারি আকারের চিংড়ি শুঁটকি। প্রতি কেজির দাম পড়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকা।
ইব্রাহিম বলেন, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা চিংড়ি শুঁটকির। চট্টগ্রামের অনেক পরিবারের রান্নাঘরে এটি নিয়মিত ব্যবহার হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ভর্তা ও ভাজিতে চিংড়ি শুঁটকি দেওয়া হয়। এ কারণে অন্য অনেক শুঁটকির তুলনায় চিংড়ি শুঁটকির বিক্রিও বেশি।
বাজার ঘুরে দেখা গেল, ছুরি শুঁটকির দামও কম নয়। ভালো মানের ছুরি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে। লইট্টার দাম ৬০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ফাইস্যা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। চ্যাপা শুঁটকির কেজি ৫৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। আর যাঁরা একটু অভিজাত স্বাদের খোঁজ করেন, তাঁদের জন্য রয়েছে কোরাল ও লাক্ষা। এই দুই শুঁটকির দামই বাজারের শীর্ষে। এর মধ্যে কোরাল শুঁটকি ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু। মানভেদে দাম বাড়ে। আর লাক্ষার দাম প্রতি কেজি কমপক্ষে ৫ হাজার। ব্যবসায়ী মনসুর আলম বলেন, আগে দেশীয় শুঁটকির সরবরাহ বেশি ছিল। এখন উৎপাদন কমেছে। অনেক শুঁটকি বাইরে থেকে আনতে হয়। ফলে দামও আগের তুলনায় বেড়েছে।
কলসির ভেতরে শুঁটকির ভান্ডার
আছাদগঞ্জের বাজারে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে সারি সারি মাটির কলসি। কোনোটি দোকানের সামনে। কোনোটি ভেতরে স্তূপ করে রাখা। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে হয়তো আচার কিংবা অন্য কোনো খাদ্যপণ্য রাখা আছে। কাছে গেলেই ভেসে আসে পরিচিত গন্ধ। কলসিগুলোর ভেতর ভর্তি চ্যাপা শুঁটকি।
মেসার্স সুকোমল বড়ুয়া প্রতিষ্ঠানের সামনে এমন অর্ধশতাধিক কলসি দেখা গেল। একটির মুখ খুলতেই দেখা যায়, স্তরে স্তরে সাজানো শুঁটকি। বহু বছর ধরে এভাবেই শুঁটকি সংরক্ষণ করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সুমন বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, কলসিতে রাখলে শুঁটকি দীর্ঘদিন ভালো থাকে। একটি কলসিতে ৮ থেকে ৯ কেজি পর্যন্ত শুঁটকি রাখা যায়। তবে মুখ শক্ত করে বেঁধে দিতে হয়, যাতে বাতাস ঢুকতে না পারে। বাতাস ঢুকলে শুঁটকির মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শুধু সুকোমল বড়ুয়ার দোকান নয়, আছাদগঞ্জের আরও অনেক ব্যবসায়ী এখনো এই পুরোনো পদ্ধতি অনুসরণ করেন। বাজারের ভেতরে হাঁটলে নানা দোকানের সামনে চোখে পড়ে এমন মাটির কলসি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সংরক্ষণের ধরনও। গরম বাড়ায় এখন বেশির ভাগ শুঁটকি রাখতে হচ্ছে হিমাগারে। ব্যবসায়ী আলী আহমদ বলেন, ছোট আকারের শুঁটকি এখনো কলসিতে রাখা যায়। কিন্তু বড় পরিমাণে শুঁটকি সংরক্ষণ করতে হলে হিমাগারের বিকল্প নেই। এতে খরচ বাড়ে। তবু পণ্যের মান ঠিক রাখতে সেই পথেই হাঁটতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
শুঁটকির বাজার কত বড়
আছাদগঞ্জের ব্যস্ত শুঁটকি বাজার শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়। এটি দেশের শুঁটকি বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রও। এক দশকের বেশি সময় আগে করা একটি গবেষণায় সেই চিত্রই উঠে আসে। ‘বাংলাদেশের একটি আদর্শ শুঁটকি বাজারের অবস্থা: চট্টগ্রামের আছাদগঞ্জ শুঁটকি বাজারের ওপর একটি গবেষণা’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০১২ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব লাইফ সায়েন্সেস বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড ফার্মা রিসার্চ-এ প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণায় আছাদগঞ্জকে দেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকি পাইকারি বাজার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকেরা বাজারটিতে ৬৩ প্রজাতির শুঁটকির সন্ধান পেয়েছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল লইট্টা শুঁটকি। উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে শুঁটকিকে পেরোতে হয় ব্যাপারী, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাসহ একাধিক ধাপ। সংরক্ষণাগারের অভাব, পরিবহন ব্যয়, পুঁজির সংকট, বাজার তথ্যের ঘাটতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে খাতটির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ওই গবেষণায়।
এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আছাদগঞ্জের গুরুত্ব কমেনি। তবে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারটি এখন আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান হায়দার বলেন, বর্তমানে আছাদগঞ্জে ৫০টি শুঁটকির আড়ত রয়েছে। দোকান আছে ৩৩০টি। আড়ত ও দোকান মিলিয়ে বছরে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।
মো. ওসমান হায়দার বলেন, দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদার বড় একটি অংশ এখন আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে লইট্টা, ফাইস্যা, পোয়া, নাইলা ও ছোট ছুরি মাছের শুঁটকি বেশি আসে। তবে আমদানিতে খরচও কম নয়। প্রতি কেজি শুঁটকি আমদানিতে সরকারি শুল্ক ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা ব্যয় হয়। সেই প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদরেও পড়ে।
ওসমান হায়দারের ভাষ্য, শুঁটকি মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের খাবার। এক কেজি শুঁটকি দিয়ে একটি পরিবার ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত খেতে পারে। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা ও বাড়তি শুল্কের কারণে দামও বাড়ছে। শুল্ক কমানো গেলে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম দামে শুঁটকি কিনতে পারবে।