বাংলাদেশ

লোডশেডিংয়ে অসন্তোষ, নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি 

August 13, 2026
6 days ago
By SAJ
লোডশেডিংয়ে অসন্তোষ, নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি 

চলমান গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। এর প্রায় পুরোটাই হচ্ছে ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। লোডশেডিং নিয়ে অসন্তোষও আছে। বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চেয়েছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর স্থানীয় কার্যালয়। 

এরই মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ আরও কমেছে। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে ১০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে গতকাল বুধবার দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২০৩ কোটি ঘনফুট, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দেশের সব বিপণিবিতান, মার্কেট ও দোকানপাট খোলার সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন নিয়মে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। নতুন এ সিদ্ধান্ত গতকাল থেকেই কার্যকর করা হয়েছে।

জ্বালানিসংকটে সারা দেশে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট বেড়ে যাওয়ায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ সদর দপ্তরে গতকাল চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। এতে বলা হয়, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় অত্যধিক লোডশেডিংয়ের কারণে জনরোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলা হচ্ছে। সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপকেন্দ্র ও অফিসগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

সারা দেশের গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ছয়টি বিতরণ সংস্থা। এর মধ্যে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ডিপিডিসি ও ডেসকো। ঢাকায় চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরে সারা দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি। আরইবির পাশাপাশি কিছু এলাকায় করে পিডিবি। আর উত্তরাঞ্চলের শহর এলাকায় নেসকো ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর এলাকাগুলোতে ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। অন্তত তিনটি জেলায় নেসকো, ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থানীয় কর্মকর্তারা পুলিশের সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। 

সপ্তাহখানেক ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছাড়িয়ে যাচ্ছে তিন হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, গত রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সোমবার এটি বেড়ে হয় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার এটি হয় ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট আর গতকাল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট। 

পিডিবি ও আরইবি সূত্র বলছে, ১১ আগস্ট রাত ১২টায় সারা দেশে মোট লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। একই সময়ে আরইবির এলাকায় লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৩৪ মেগাওয়াট। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের মানুষ বেশি কষ্ট পাচ্ছে। কিছুটা উদ্বেগ থাকতেই পারে বিদ্যুৎ বিতরণে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি উন্নতির সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য কমিয়ে আনার চিন্তা করছে সরকার। 

গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোয় নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশ মোতায়েন এবং রাতে নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে সৈয়দপুর থানায় গতকাল লিখিত আবেদন করেছে নেসকোর সৈয়দপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ। চিঠিতে বলা হয়, সারা দেশের মতো সৈয়দপুরেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

নেসকোর পক্ষ থেকে পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করে সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রেজাউল করিম রেজা বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

নীলফামারীতে অফিস এবং বিদ্যুৎ বিতরণের উপকেন্দ্রসমূহে নিরাপত্তা চেয়ে গত মঙ্গলবার থানায় চিঠি দিয়েছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। জেলার ছয়টি থানায় ওই চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. খুরশীদ আলম। তিনি বলেন, ৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাচ্ছেন ৪৫ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা খারাপ থাকায় নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। 

ডোমার থানার ওসি মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, বিদ্যুতের সব স্থাপনায় পুলিশ মোতায়েনসহ টহল অভিযান অব্যাহত আছে। 

কুষ্টিয়ায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সোম ও মঙ্গলবার পৃথক দুটি চিঠির অনুলিপি জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে। 

ওজোপাডিকো কুষ্টিয়া কার্যালয় থেকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, এলাকায় ব্যাপক হারে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর ফলে জনমনে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংকটময় এ পরিস্থিতিতে কেপিআইভুক্ত স্থাপনাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক স্থাপনার ওপর নাশকতা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, চাহিদা ১৫৫ মেগাওয়াট, পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট। ফলে ৬০-৭০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। 

কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, দুটি চিঠি বুধবার সকালে দেখেছেন। পুলিশের নজরদারি রয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এর আগে মঙ্গলবার গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপারকে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে ওজোপাডিকোর স্থানীয় কার্যালয়।

সচিবালয়ে গতকাল দুপুরে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ভোগান্তি চরমে, এটি নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বারবার দুঃখ প্রকাশ করছি। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’

আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট ও দেশীয় কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত হয়। যানবাহনেও সিএনজি পেতে দীর্ঘ সারি পড়ে যায় ফিলিং স্টেশনে। 

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার আছে। প্রতিটি বয়লারের সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি থেকে বৃহস্পতিবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করতে কাজ চলছে। 

সামিটের টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নিতে না পারায় সোমবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে পেট্রোবাংলার নির্দেশে সরবরাহ কমিয়ে দেয় সামিট। গতকাল এটি ১০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহ ব্যাহত হতেই পারে। অন্তর্বর্তী সরকার তৃতীয় টার্মিনাল বাতিল না করলে হয়তো এ পরিস্থিতি হতো না। অন্তত ৭ থেকে ১৫ দিনের এলএনজি মজুতের সক্ষমতা করতে হবে। আর জ্বালানিসংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করা যাবে না। হামলার শঙ্কা দূর করতে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। মানুষকে পরিস্থিতি তথ্য তুলে ধরতে হবে। বিল থেকে গ্রাহকদের কিছু ছাড়ও দিতে পারে সরকার। 

[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া এবং প্রতিনিধি, নীলফামারী ও সৈয়দপুর]