মাসে ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পান সংসদ সদস্যরা, তারপরও গাড়ি চাওয়া নিয়ে প্রশ্ন
প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পান জাতীয় সংসদের সদস্যরা। তবু সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তরুণ সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)। তাঁকে এক রকম সমর্থন করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে বলেছেন, ছোটদের আবদারে সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়।
গতকাল মঙ্গলবার সংসদের অধিবেশনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এই গাড়ি চাওয়া এবং তাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সমর্থনের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সংসদ সদস্যরা যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা পাওয়ার পরও এমন চাওয়ার কারণ কী, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর সিলেটে দলের এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ‘আগামীতে আমাদের একজনও যদি এমপি নির্বাচিত হন, তাঁদের কেউ সরকারি প্লট নেবেন না ও বিনা ট্যাক্সের গাড়িতে চলবেন না।’ সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্য হাসনাত কেন গাড়ি চাইলেন, সমালোচকেরা সে বিষয়টি সামনে আনছেন।
হাসনাত সংসদে গাড়ির দাবি তোলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ ব্যাপারে বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। সেটি হলো গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘অনুশাসন’ দিয়েছিলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না। অবশ্য একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আলোচনার ভিত্তিতে একটি বিহিত করতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।
গাড়ির দাবি নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার সংসদে একটি ব্যাখ্যা দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এই বক্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট নেবেন না—এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ডসহ অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের যে প্রক্রিয়ায় গাড়ি দেওয়া হয়, সংসদ সদস্যদেরও একই প্রক্রিয়ায় গাড়ি দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি কোনো শুল্কমুক্ত গাড়ি চাননি।
তবে সংসদ সদস্যদের এভাবে গাড়ি চাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের জন্য মাসিক ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা রয়েছে। এরপরও গাড়ি চাওয়ার সুযোগ নেই। শুল্কমুক্ত গাড়ির বিষয়টি যেহেতু প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, ফলে গাড়ি চাওয়াটা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের মতো যদি গাড়ি চাওয়া হয়, তাহলে বলতে হয় নিজেদের সুবিধা বিবেচনায় সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তার পার্থক্য তাঁরা বুঝতে চাইছেন না।’
আলোচনায় ‘বসার কক্ষও’
গত ৩১ মার্চ নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা করে দেওয়ার জন্য সংসদে দাবি জানিয়েছিলেন এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ। গতকাল সংসদ অধিবেশনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পরামর্শে প্রতিটি উপজেলা পরিষদের দোতলায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বসার জন্য একটি কক্ষ প্রস্তুত করে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই কক্ষের নাম হবে ‘পরিদর্শন কক্ষ’।
বসার জায়গার ব্যবস্থা করার জন্য সেদিন সংসদে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ সব সংসদ সদস্যের জন্য সরকারি গাড়ির ব্যবস্থা করার দাবি জানান। তাঁর এ বক্তব্যে টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান অনেকে।
গাড়ির বিষয়টির মতো সংসদ সদস্যদের বসার জায়গার ব্যাপারেও আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, উপজেলা পরিষদে এমন ব্যবস্থার ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আরও দুর্বল হতে পারে। স্থানীয় সরকারের ওপর সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির ফলে জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা স্থানীয় সরকারের ভূমিকাকে খর্ব করার শামিল। ক্ষমতা খর্ব করার পাশাপাশি এটি স্থানীয় সরকারের বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করবে। সংসদ সদস্যদের এ ধরনের ভূমিকার কোনো এখতিয়ার নেই। এমন দাবির কারণ ধারণার অভাব অথবা ক্ষমতার অপব্যবহারের চিন্তা।
সুযোগ-সুবিধা নিয়েও আলোচনা
সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংসদে দাবি ওঠার পর সংসদ সদস্যরা কী কী সুযোগ-সুবিধা পান, সেই আলোচনাও নতুন করে সামনে এসেছে। সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’-এ উল্লেখ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যের মাসিক পারিশ্রমিক ৫৫ হাজার টাকা। সংসদ সদস্যের মাসিক যাতায়াত ভাতা ৭০ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকা ভাতা সাড়ে ১২ হাজার টাকা, আপ্যায়ন ভাতা ৫ হাজার টাকা, টেলিফোন ভাতা ৭ হাজার ৮০০ টাকা, ধোলাই ভাতা দেড় হাজার টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ৭০০ টাকা। ভাতাগুলো আয়করমুক্ত। নির্বাচনী এলাকায় অফিস রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে ১৫ হাজার টাকা করে পান সংসদ সদস্যরা। থালাবাসন, টয়লেট্রিজ ও অন্যান্য পণ্য কেনার জন্য পান ৬ হাজার টাকা করে।
সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য টিএ (পরিবহন ভাতা) পান সংসদ সদস্যরা। সড়কপথে প্রতি কিলোমিটারে ১০ টাকা হারে এই ভাতা দেওয়া হয়। দায়িত্ব পালনকালীন ঢাকায় অবস্থানের জন্য প্রতিদিন ৭৫০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা হিসেবে ৭৫ টাকা পান সংসদ সদস্যরা। আর দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিদিন ৮০০ টাকা ভাতা ও ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান।
এর বাইরে আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছরে একটা কর ও শুল্কমুক্ত গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন সংসদ সদস্যরা। এ ছাড়া বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ভ্রমণ ভাতা এবং ১০ লাখ টাকার বিমাসুবিধা পান একজন সংসদ সদস্য।