অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন ডলার খরচ : অর্থমন্ত্রী

August 22, 2026
1 month ago
By SAJ
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন ডলার খরচ : অর্থমন্ত্রী

চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সরকারের জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন বা ৪০০-৫০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে এবং বাজেটে এ লক্ষ্যে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন এই খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা দরকার।

আজ ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা যত গভীরেই থাকুক, সেগুলো নিরসন করা হবে। ডিরেগুলেশন (সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানো) বলা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন ততটা কঠিন। তবে সরকার এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যমান বিদ্যুৎ, গ্যাসের সমস্যা এক দিনে সমাধান হবে না। এ জন্য সময় লাগবে। জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। আর্থিক খাত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যারা প্রণোদনার শর্ত পূরণ করতে পারবে, তারা ঋণ সহায়তা পাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না।

কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো না গেলে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না বলে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। অর্থায়নের জন্য প্রচলিত উৎসের বাইরে বিকল্প অর্থায়ন সুবিধা বাড়াতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই তার সুফল দেশবাসী পাবেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছি। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না; বরং পিছিয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে হয়রানি বিষয়টি একটা নেতিবাচক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। ফলে সংস্কার কার্যক্রম কাজে আসছে না। করজাল সম্প্রসারণে হয়রানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।’

হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যা নিরসন করতে হবে। পাশাপাশি এসএমইদের ঋণসুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নজরদারির জন্য ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দেন এই অর্থনীতিবিদ।

আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সেই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘আমাদের নীতিমালা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বেশ ফারাক রয়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে আমরা যতটা উদার, পণ্য আমদানিতে যতটাই কঠিন।’ উচ্চ শুল্কহার থাকায় স্থানীয়ভাবে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের মূল্য বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বিপ্লব ঘটাতে হবে। বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি অর্জন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বাজেটের কিছু ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন নেই, ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতি সংস্কার করা জরুরি।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রমুখ। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, আবুল কাসেম খান, বেনজীর আহমেদ ও রিজওয়ান রাহমান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক বলেন, প্রবাসী আয়নির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ সময়ের জন্য মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার খুবই উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করা বেশ কঠিন। তাই ব্যাংকের তারল্য বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, বাজেটে ব্যবসাসহায়ক নীতি থাকলেও বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। এ জন্য উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাত থেকে সরকারের বেশি ঋণ গ্রহণই প্রধানত দায়ী। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া বন্দর ও কাস্টমস সেবার দক্ষতা বাড়াতে সরকারের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি।

ব্যাংকার সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, জ্বালানি প্রাপ্তিসহ সহায়ক ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে শুধু সুদহার কমিয়ে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। এটি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।