অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা, বাংলাদেশের শঙ্কা কতটা

October 22, 2026
4 days ago
By SAJ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা, বাংলাদেশের শঙ্কা কতটা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধি ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার। চলতি সপ্তাহের পুরো সময় তেলের দাম ১১০ ডলারের আশপাশে আছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পূর্বাভাস, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বে তেলের চাহিদা কমবে। তেলের বাজারে একদিকে সরবরাহ–সংকটের আশঙ্কা, অন্যদিকে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রবণতা—দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই নানামুখী ঘটনায় তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা আছে।

বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে দেরি হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি আছে। তবে দাম খুব একটা বাড়বে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার ও তেল পরিবহনে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের নতুন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকে কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।

বুধবার সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের বেসামরিক বিমানবন্দরে যে হামলা চালায় হুতিরা, তাতে একজন নিহত ও আটজন আহত হন। একই দিনে সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হন। এসব ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

তেল পরিবহনেও ঝুঁকি বাড়ছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, দুই সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত ১৮টি হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির বাইরেও ওমান উপসাগর পর্যন্ত ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু উৎপাদন নয়, তেল রপ্তানি ও পরিবহনের ধারাবাহিকতা নিয়েও বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ। গত সপ্তাহে দেশটির মজুত ৩০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল কমে ৪১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। ফলে গত মঙ্গলবার তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ৭৫ ডলারে ওঠে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর–ডিসেম্বর) বিশ্বে তেলের চাহিদা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। পুরো বছরে চাহিদা কমতে পারে দৈনিক ২৬ লাখ ব্যারেল।

আইইএর পূর্বাভাস অনুসারে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ–সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। চাহিদা কমতে পারে ডিজেলের। ২০২৭ সালে তেলের ব্যবহার দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল বাড়লেও তা ২০২৫ সালের তুলনায় দৈনিক ৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল কম থাকবে।

সেপ্টেম্বরে বিশ্বে তেলের সরবরাহ আগের মাসের তুলনায় দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল বেড়ে ১০ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০২৬ সালে বার্ষিক সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৫৮ লাখ ব্যারেল কমতে পারে।

সেপ্টেম্বরে বিশ্বে তেলের মজুত কমেছে এক কোটি ব্যারেল। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগের তুলনায় যা কমেছে ৫০ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত থাকলে সরবরাহ পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে। ফলে তেলের দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে যায়।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। এতে চাপ তৈরি হবে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। বাংলাদেশে জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারনির্ভর নয়। সরকার প্রতি মাসের শুরুতে দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই যে দেশের বাজারে দাম বেড়ে যাবে, এমন নয়। তবে বাড়তি খরচ বহনের সক্ষমতাসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

বাজারে দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের উৎপাদনসহ জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায়। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অভিঘাত পড়বেই, তবে এর চেয়ে বেশি শঙ্কার কারণ হলো অনিশ্চয়তা। অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হবে। ফলে বাংলাদেশ যে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চক্রের মধ্যে পড়ে গেছে, তা থেকে বেরোতে বেগ পেতে হবে। সরকারের নীতিগত অবস্থানেও পরিষ্কার কিছু নেই, বাংলাদেশ কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বেরোবে।

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে, এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, অতীতেও সরকার বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, কিন্তু তা অর্জিত হয়নি। সে জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করছে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক থাকে, বাড়তি দাম বিশ্ব অর্থনীতির চাহিদা কতটা কমিয়ে দেয়—এসবের ওপর।

সরবরাহের ঘাটতি ও মজুত কমে আসার কারণে দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। আবার উচ্চ মূল্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে চাহিদা কমে গেলে দাম বৃদ্ধির গতি সীমিত হবে। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।