আন্তর্জাতিক

মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত রাহুল–প্রিয়াঙ্কা

July 21, 2026
4 weeks ago
By SAJ
মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত রাহুল–প্রিয়াঙ্কা

ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন–নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান শুরু করেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পুলিশ তাঁদের জোর করে সরিয়ে দেয়। বাস বোঝাই করে নেতাদের নিয়ে যাওয়া হয়। জবরদস্তি করে নিয়ে যাওয়ার সময় রাহুল গান্ধীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। এর দুই ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দেশের ছাত্রসমাজ গত সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে গেলে দিল্লি পুলিশ তাঁদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এর প্রতিবাদে ও আলোচনার দাবিতে গতকাল রাহুলসহ বিরোধী নেতারা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় বিকেলে আচমকা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তাঁরা ধরনায় (অবস্থান কর্মসূচি) বসেন।

এরপর রাহুল পরপর কয়েকটি বার্তা দেন ‘এক্স’ হ্যান্ডলে। একটিতে বলেন, ‘পুলিশি অত্যাচারের জবাব চাইতে এসেছি। এই সরকার কোনো দায় নিতে চায় না। সংসদে আলোচনা চায় না। দেশের যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।’

অন্য এক বার্তায় রাহুল বলেন, ছাত্রদের ওপর আক্রমণ প্রতিটি ভারতীয় পরিবারকে আক্রমণের শামিল। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, কোনো জবাবদিহি না করে পার পেয়ে যাবেন। এবার তা হবে না। ওই বার্তায় দেশপ্রেমিক প্রতিটি পরিবারকে ধরনায় শামিল হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে রাহুল বলেন, ছাত্রদের আওয়াজ বিফলে যাবে না।

রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গতকাল সংসদ ভবন থেকে যান রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে পুলিশের হামলায় আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখতে। সেখান থেকে ফিরে তাঁরা খাড়গের বাড়ি যান। সেখানেই ঠিক হয়, তাঁরা সদলে ৭ লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে ধরনায় বসবেন। সেই অনুযায়ী বেলা সাড়ে তিনটায় তাঁরা অবস্থান শুরু করেন পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের হকচকিত করে। কিছু সময়ের মধ্যে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে যান প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন। রাহুলের সঙ্গে জিতেন্দ্র সিংকে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়। এরপর তাঁরা চলে যান।

ইতিমধ্যে ধরনায় ভিড় বাড়তে থাকে। কেরলম ও কর্ণাটকের দুই কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে ভি ডি সতীশন এবং ডি কে শিবকুমার, কে সি বেনুগোপাল, এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ অনেকেই ধরনাস্থলে চলে আসেন। কংগ্রেসের নেতা–কর্মীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জিতেন্দ্র সিং গণমাধ্যমকে জানান, রাহুল গান্ধীর দাবি ছিল সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সরকার তা মেনে নিয়েছে। তাঁকে বলা হয়, সরকার আজ বুধবারেই আলোচনায় প্রস্তুত। কিন্তু তারপর রাহুল মন বদলান। তিনি বলেন, শুধু আলোচনা নয়, শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হবে।

সরকার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানতে রাজি হয়নি। এরপরই ঠিক হয়, জোর করে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হবে। দিল্লি পুলিশ সেটাই করে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ সব নেতাকে জবরদস্তি করে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। রাহুলকে মাটিতে শুয়ে পড়তে দেখা যায়। ১০–১২ জন পুলিশ তাঁকে জবরদস্তি করে উঠিয়ে বাসে তোলেন। ধস্তাধস্তির সময় রাহুলের নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। পরে রাহুল গান্ধীসহ আটক নেতাদের একটি দলকে বাসে করে দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে রাহুল গান্ধী চলে যান। আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে নেওয়া হয় দিল্লির মন্দির মার্গ থানায়। ঘটনার পর কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ওই থানায় ছুটে যান। রাত ৯টা নাগাদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুক্তি পান।

ভারতে মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তি পরীক্ষার (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি–কাম–এনট্রান্স টেস্ট–নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে নানা ধরনের দুর্নীতির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দুই মাস ধরে আন্দোলন করছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে প্রথমে দিল্লি, তারপর দেশের নানা শহরে তারা বিক্ষোভ দেখিয়েছে। প্রায় এক মাস আগে তারা দিল্লিতে নতুন করে ধরনা কর্মসূচি নেয়। ২৪ দিন আগে সে অবস্থান আন্দোলন শুরু করলে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক ছাত্রদের সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন।

২০ জুলাই শুরু হয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। সিজেপি নেতারা আগেই জানিয়েছিলেন, শুরুর দিনেই তাঁরা সংসদ ভবনে অভিযান করবেন। তার ঠিক দুই দিন আগে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান মঞ্চ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় সোনম ওয়াংচুককে। ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।

পুলিশ ভেবেছিল, এতে শিক্ষার্থীরা হতোদ্যম হবেন। কিন্তু দেখা গেল, সোমবার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ সংসদ ভবন অভিমুখে কর্মসূচিতে শামিল হলেন। এত বিপুল মানুষ, পুলিশি অনুমান অন্তত ৫০ হাজার, সব বাধা পেরিয়ে সংসদের দিকে যাত্রা করবে, তা ভাবা যায়নি। পুলিশ ও প্রশাসন এই ব্যর্থতা চাপা দিতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর লাঠিপেটা করে ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। দুই পক্ষে লড়াই শুরু হয়ে যায়। শতাধিক পুলিশ ও শতাধিক ছাত্রছাত্রী আহত হন। রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ আম আদমি পার্টির নেতারা হাসপাতালে গিয়ে আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখে আসেন। দেখা করেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডাও।

প্রায় এক মাস ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি সরকার। সোমবার দুই ছাত্রনেতার সঙ্গে দেখা করেন নাড্ডা। সিজেপি নেতারা তাঁকে তিনটি দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি দেন। তাতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়া ও নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যাকারী ২০ ছাত্রছাত্রীর পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। সিজেপি নেতারা গতকাল বলেন, সরকার একটি দাবিও মেনে নেয়নি।

যদিও গতকালই দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, সোনম ওয়াংচুকের অধিকার আছে তাঁর পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর। সেই অনুযায়ী বিকেলে তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জানান, সোনম অনশন প্রত্যাহার করছেন না।

সোমবারের ঘটনার পর দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের ধরনামঞ্চ ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ছাত্রনেতারা গতকাল সকালে নতুন করে সেখানে অবস্থান শুরু করেন। তবে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে জানান, তাঁরা সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রার ডাক এখন আর দেবেন না। দাবি না মেটা পর্যন্ত আন্দোলন চালানো হবে।

কয়েক দিন ধরে প্রায় সব বিরোধী দল এ আন্দোলনকে সমর্থন করছে। প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস এ আন্দোলন সমর্থন করেনি। কিন্তু সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করতে যান কংগ্রেস নেতারা। রাহুল গান্ধীও বিবৃতি দেন আন্দোলনের সমর্থনে। গতকাল আন্দোলনকারীদের সুরে সুর মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে সাড়ে তিন ঘণ্টার জন্য ধরনায় বসেন। এমন কাজ এর আগে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা করেননি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে কেউ কোনো দিন ধরনায় বসেননি।