মৃত্যু সবই হামে, উপসর্গে নয়
শিশুদের মৃত্যু হামে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামের উপসর্গ থাকলে সেটিও হামে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
হামে মৃত্যু ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তারা কিছু মৃত্যুকে সন্দেহজনক হামের কারণে হচ্ছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করছে।
মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করতে থাকে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল প্রথম আলোকে হামে মৃত্যুর তথ্য দেয়; কিন্তু এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর মধ্যে বিভাজন টানে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কিছু মৃত্যুকে বলছে নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু; আর বলছে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের উপসর্গ থাকলে সবই হাম রোগে মৃত্যু।
১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ) এবং ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির (এনভিসি) যৌথ সভায় বিশেষজ্ঞরা এই মত দেন।
টিকা বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিতে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি হলো নাইট্যাগ; আর রোগ শনাক্তকরণের যেসব ব্যবস্থা দেশে আছে, সেগুলোর মান ও সক্ষমতা যাচাই করে এনভিসি। নাইট্যাগের চেয়ারপারসন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এনভিসির চেয়ারপারসন ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তা এবং ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে প্রথম আলোকে বলা হয়েছিল, হামে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলা হয়, সন্দেহজনক হামে মৃত্যু ৩২ এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ২। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে পাঠকের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ আছে।
যেসব মৃত শিশুর নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; কিন্তু হামে আক্রান্ত সব শিশুর নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না। তাদের ক্ষেত্রে অধিদপ্তর বলছে, সন্দেহজনক হামে মৃত্যু।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দেওয়া তথ্য বলছে, এ বছর সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১৯৪ জনের এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৩৯ জনের। যদিও প্রকৃত পক্ষে হামে এ বছর ২৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধরেই নেওয়া যায় যে এখন পর্যন্ত যারা মারা গেছে, তাদের সবাই হামে আক্রান্ত ছিল; কিন্তু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ব্যতীত এটা বলা উচিত না যে সবাই হামেই মারা গেছে। ১০০ জনের মধ্যে হয় তো একজনের মৃত্যুর কারণ হাম ছিল না। পরীক্ষা করা যায়নি বলে সেই একজনের মৃত্যুকে হামে মৃত্যু বলা উচিত নয়।’
তবে নাইট্যাগ ও এনভিসির যৌথ সভায় উপস্থিত একজন জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, হামের উপসর্গ যাদের দেখা দেয় বা উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তারা হামের রোগী। তাদের মৃত্যু হামেই হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হামের উপসর্গ থাকলেই সে হামের রোগী। মৃত্যুর সময় সন্দেহজনক হাম বললে মানুষের মনে সন্দেহ জাগে। মানুষ মনে করে, সরকার মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানোর জন্য এসব করছে। প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার একটি পন্থা হচ্ছে মানুষকে ঠিক তথ্য দেওয়া। বিভ্রান্তি প্রাদুর্ভাব বাড়ায়।