খেলা

মস্কোর সেই ম্যাচের আট বছর পর

June 17, 2026
4 months ago
By SAJ
মস্কোর সেই ম্যাচের আট বছর পর

২০১৮ বিশ্বকাপে মস্কোর সেই ম্যাচ।

কিয়েরান ট্রিপিয়ারের ফ্রি-কিক যখন ক্রোয়াট জালে জড়াল, বিগ বেনের ঘণ্টার মতো বেজে উঠেছিল গ্যালারিতে ব্রিটিশদের গর্জন— ‘ইটস কামিং হোম’। কিন্তু ইভান পেরিসিচের গোলে সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে মারিও মানজুকিচের গোল চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল ইংলিশদের স্বপ্ন। সেই রাতের ক্ষতটা আজও সতেজ ব্রিটিশ মিডিয়ার পাতায়।

আট বছর পর আরও একটা বিশ্বকাপ, ডালাসে বাংলাদেশ সময় আজ রাত দুইটায় আবার মুখোমুখি ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া। সেই ম্যাচের মতো এটা বাঁচামরার লড়াই নয়। এই ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে ‘এল’ গ্রুপের লড়াই। আরও দুই দল ঘানা ও পানামা থাকলেও কাগজে-কলমে বড় ম্যাচ এটাই । জয় মানে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। পরাজয় মানে শুরুতেই চাপ।

বাছাইপর্বে আট ম্যাচের সব কটি জিতে বিশ্বকাপে এসেছে ইংল্যান্ড, গোল হজম করেনি একটিও। পরিসংখ্যান বলছে, তারা প্রস্তুত। কিন্তু ইংল্যান্ডের ইতিহাস বলে, প্রস্তুতি আর পারফরম্যান্স সব সময় এক হয় না। ১৯৬৬–এর পর বিশ্বকাপ তাদের জন্য প্রায়ই এক ধাঁধা, যেখানে সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু সমাধান মেলে না।

জার্মান কোচের এই দলটা যেন একটা নিখুঁত সুইস ঘড়ি, সবকিছু চলে নিয়ম মেনে। শিল্পের চেয়ে শৃঙ্খলাই তাদের প্রধান সৌন্দর্য। মাঝমাঠে ডেকলান রাইসের দৃঢ়তা, জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, বুকায়ো সাকার ছুটে চলা—সব মিলিয়ে এক সিম্ফনি।

আর সামনে হ্যারি কেইন, সর্বশেষ দুটি বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পের পরেই সবচেয়ে বেশি গোল এই স্ট্রাইকারের। উত্তর আমেরিকায়ও তাঁর গোলই হয়তো নির্ধারণ করবে ইংল্যান্ডের ভাগ্য।

কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে কেইনের ট্রফি ক্যাবিনেটে শূন্যতা তো এক চিরকালীন ট্র্যাজেডি। যেন গ্রিক পুরাণের সিজিফাস, পাথরখণ্ডকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যান, আর শেষ মুহূর্তে তা গড়িয়ে পড়ে। কেইন কি এবার পারবেন সেই পাথরকে চূড়ায় স্থির করতে?

তবে টুখেলের সবচেয়ে মধুর সমস্যাটা বোধহয় ‘নাম্বার টেন’ পজিশন নিয়ে, যেখানে বেলিংহামের রাজকীয় উপস্থিতির সমান্তরালে নিশ্বাস ফেলছেন মরগান রজার্স।

আরেক মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসনের আজ ৩৬তম জন্মদিন। মাঠের বাইরে থেকে হয়তো তিনি ছড়াবেন অভিজ্ঞতার আলো। হেন্ডারসন ম্যাচের আগে বলছিলেন, ‘টুর্নামেন্টে কঠিন সময় আসবেই। তখন দল হিসেবে একসঙ্গে থাকাটাই আসল।’

এই একসঙ্গে থাকার দর্শনটাই ইংল্যান্ডের আসল মন্ত্র। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া এসেছে অভিজ্ঞতার ভান্ডার নিয়ে। তারা কখনো পুরোপুরি ফেবারিট নয়, আবার কখনো অবহেলার দলও নয়।

একধরনের ধৈর্যের প্রতীক। ফুটবল যখন দ্রুতগামী হয়ে উঠেছে, তখন ক্রোয়েশিয়া যেন সময়কে ধীরে টেনে নেয়। বলের গতি কমায়, ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে, আর প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলে।

এই দলের কেন্দ্রবিন্দু এখনো লুকা মদরিচ। বয়স ৪০, কিন্তু তাঁর খেলা দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। এটি তাঁর পঞ্চম, সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। এক অর্থে এটি এক শিল্পীর শেষ প্রদর্শনী। পাশে মাতেও কোভাচিচ, আন্দ্রে ক্রামারিচ। নীরব, কিন্তু কার্যকর।

তাঁরা মিলে তৈরি করেন এমন এক মিডফিল্ড, যা খেলা ও সময় দুটোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হবে এই মিডফিল্ডে। ইংল্যান্ডের উচ্চগতির প্রেসিং বনাম ক্রোয়েশিয়ার ধীর, নিয়ন্ত্রিত পজেশন। দুটি ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে ঝড়, অন্যদিকে নদী।

পরিসংখ্যান বলছে, ইংল্যান্ড এগিয়ে। সর্বশেষ আটটি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচে মাত্র এক হার। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার ওপেনিং রেকর্ড ততটা উজ্জ্বল নয়। ছয় ম্যাচে মাত্র দুটি জয়। কিন্তু পরিসংখ্যান সব সময় গল্প বলে না। মাত্র ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেই তিনবার সেমিফাইনাল পর্যন্ত গেছে। বড় মঞ্চে নিজেদের বারবার প্রমাণ করেছে।

ইংল্যান্ড অবশ্যই চাইবে, আট বছর আগে মস্কোর সেই ম্যাচের স্মৃতিতে প্রলেপ দিতে। কিন্তু সেই ক্ষতের ওপর নুনের ছিটা দিতে আরও একবার তৈরি হয়ে আছে ক্রোয়াটরা।