মুঠোফোনে কথা বলার ক্ষেত্রে ‘ভয়েস ফ্লোর প্রাইস’ তুলে দেওয়ার পরামর্শ
২০১৮ সালে যখন ৪জি সেবা চালু হয়, তখন মোবাইল অপারেটরদের স্পেকট্রাম কেনাসহ নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছিল। সে সময় অপারেটরদের আয় নিশ্চিত করতে, বিনিয়োগের টাকা দ্রুত তুলে আনতে ‘ভয়েস ফ্লোর প্রাইস’ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ‘ভয়েস ফ্লোর প্রাইস’ তুলে দেওয়া দরকার।
আজ রোববার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস মূল্যসীমা প্রত্যাহার প্রস্তাব: মোবাইল সেবাকে জনবান্ধব করতে নতুন সরকারের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারের মূল প্রবন্ধে এ কথা বলা হয়।
সেমিনারের আয়োজক ভয়েস ফর রিফর্ম ও টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম (টিআইপিএপি)। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ।
‘ভয়েস ফ্লোর প্রাইস’ হলো মোবাইল ফোনে কথা বলার জন্য সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) নির্ধারিত সর্বনিম্ন মূল্যসীমা। ২০১৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশে এমন মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হয়। রেট প্রতি মিনিট ৪৫ পয়সা। এই মূল্যসীমা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বিটিআরসির ২০১৮ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভয়েস ফ্লোর প্রাইস চালুর ফলে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের সম্মিলিত মাসিক আয় প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা বেড়েছিল। বর্তমানেও ভয়েস ফ্লোর প্রাইসের কারণে অপারেটররা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি ইবিআইটিডিএ (কোম্পানি মূল ব্যবসা থেকে কত আয় করছে) মার্জিন বজায় রাখছে, যা ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।
ভয়েস কল থেকে অপারেটররা সহজেই বড় মুনাফা করতে পারছিল বলে তারা সাধারণ মানুষের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়া বা ইন্টারনেটের প্রসারে খুব একটা তাগিদ অনুভব করেনি বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, শহরের সচ্ছল মানুষ হোয়াটসঅ্যাপে ফ্রিতে কথা বলছেন। কিন্তু স্মার্টফোনহীন গ্রামীণ গরিব মানুষকে বাধ্য হয়ে ৪৫ পয়সা মিনিট রেটে কথা বলতে হচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতায় ভয়েস ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পরামর্শ দেন মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে প্রতি কোয়ার্টারে ১৫ পয়সা করে কমিয়ে বছরের শেষ নাগাদ এই মূল্যসীমা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এর ফলে ইন্টারনেট পেনিট্রেশন ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে হঠাৎ করে ভয়েস ফ্লোর প্রাইস কমালে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে সেমিনারে মন্তব্য করেন রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভয়েস থেকে যে রাজস্ব আসে, সেটা দিয়ে ডেটার প্রচার–প্রসার করা হয়। এ কারণে দেশে ডিভাইস ব্যবহার ৭০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।
টেলিযোগাযোগ খাতের বিনিয়োগ ও মুনাফার ওপর করের প্রভাবের কথাও সেমিনারে তুলে ধরেন সাহেদ আলম। তিনি বলেন, একজন গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে ৫৬ টাকার বেশি সরাসরি সরকার পায়। ভয়েস ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার আগে সামগ্রিকভাবে ‘কস্ট স্টাডি’ করার কথা বলেন তিনি।
ভয়েস ফ্লোর প্রাইস তুলে নিলে গ্রাহক সুবিধা পাবে বলে সেমিনারে মন্তব্য করেন বিটিআরসির উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারহান আলম। তবে তা হুট করে না করে ধীরে ধীরে করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের পর টেলিযোগাযোগ সেবায় ‘কস্ট রিভিউ’ করা হয়নি, যা বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সেমিনার সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ–আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর।