বাংলাদেশ

নগদের পরিবেশকের ঠিকানায় ডাক অধিদপ্তরের কর্মকর্তার বাড়ি, নেপথ্যে কী

April 18, 2026
10 hours ago
By SAJ
নগদের পরিবেশকের ঠিকানায় ডাক অধিদপ্তরের কর্মকর্তার বাড়ি, নেপথ্যে কী

ঘটনাটি ঘটে গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৪ জুন। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষ হওয়ার ঠিক আগের দিন সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি সড়কে ছিনতাই হয় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। টাকাগুলো ছিল ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’–এর এক ডিস্ট্রিবিউটর বা পরিবেশকের।

ওই ঘটনার পর মামলা করেন আবদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে তিনি ‘নগদ’–এর ‘ডিস্ট্রিবিউটর’ হিসেবে পরিচয় দেন। ঠিকানা উল্লেখ করেন ঢাকার উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ির।

অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, ছিনতাই হওয়া ওই টাকার প্রকৃত মালিক মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি। নগদে তাঁর তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ রয়েছে। আর যে বাড়ির ঠিকানা মামলায় ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জাকির হাসান নূরের পৈতৃক বাড়ি। তিনি নিজে ওই ঠিকানাতেই থাকেন।

অদ্ভুত এই যোগাযোগের বিষয়ে জানতে তারিকুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। তারিকুজ্জামান বলেন, সম্পর্কে জাকির হোসেন তাঁর মামাতো ভাই। উত্তরা এলাকায় ব্যবসা করতে অফিস দেখাতে হতো। সে কারণেই ভাইয়ের ছয়তলা বাড়ির একটি অংশ ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি।

তবে তারিকুজ্জামানের বক্তব্য এতটা সরল ভাবা যায় না নগদের পরিবেশকের একটি অভ্যন্তরীণ গোপনীয় তালিকা দেখলে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই তালিকায় মোট ২১৬ জন পরিবেশকের তথ্য রয়েছে। যার মধ্যে ‘সরকারি কর্মকর্তা প্রভাবিত’ ক্যাটাগরিতে সাত ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি ঢাকার। সেগুলো হলো এম আর করপোরেশন, এম আর করপোরেশন-তুরাগ এবং এম আর করপোরেশন-দক্ষিণখান। নথিপত্র বলছে, তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই আবেদনকারী মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান।

এম আর করপোরেশনের আবেদনটি করা হয়েছিল ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, পরদিনই তা অনুমোদন পায়। এম আর করপোরেশন-তুরাগের আবেদন ফরমের তথ্য বলছে, আবেদনটি করা হয় ২০২৪ সালের ২৭ মে, অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে একই দিনে। অন্যদিকে এম আর করপোরেশন-দক্ষিণখানের আবেদন ফরমে আবেদনের তারিখ না থাকলেও ফরমটি ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর অনুমোদন পেয়েছে।

আবেদনপত্র বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, তিনটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। রাজধানীর কাফরুল এলাকার জনতা হাউজিং, ৫ নম্বর সড়কের ২৫ নম্বর বাড়ি। তবে তিনটি আবেদনে তিন রকম পোস্টকোড ও ডাকঘরের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর নগদ পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বসানো প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে, এম আর করপোরেশনের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ থেকে মাসিক ২০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এ থেকে শুধু কমিশন বাবদ মাসে ২৫ লাখ এবং সব খরচ বাদে মাসে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে।

মামাতো ভাই যখন ডাক অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা, তখন পরিবেশক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর প্রশ্নটি এসে যায়, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে বলে আলোচনা উঠেছে। আবার সরকারি কর্মকর্তা জাকির হাসান স্বজনের পরিচয়ের আড়ালে নিজেই পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা করছেন কি না, সেই সন্দেহও করছেন কেউ কেউ।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারিকুজ্জামান বলেন, ‘উনি ওনার চাকরি করেছেন, আমি আমার।’

যতটা সহজভাবে তারিকুজ্জামান বললেন, নথিপত্র দেখাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্যপট। ডাক বিভাগের নথিপত্র বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জাকির হাসান কখনো নগদ-সংক্রান্ত কাজে দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন, চুক্তি স্বাক্ষরে যুক্ত ছিলেন; আবার কখনো ডাক বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি নগদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ই তারিকুজ্জামানের দুটি আবেদন অনুমোদন পায়।

২০১৭ সালে ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবার অংশীদার নির্বাচনপ্রক্রিয়ার একাধিক কমিটির সদস্য ছিলেন জাকির হাসান। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক তালিকা বাছাই, কারিগরি মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত নির্বাচন—সব পর্যায়েই তাঁর অংশগ্রহণ ছিল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয় ডাক বিভাগের, যার ভিত্তিতে পরে নগদ চালু হয়।

নগদে জাকির হাসানের আগ্রহের একটি প্রমাণ পাওয়া যায় ডাক বিভাগের এক নথিতে। ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল সমমান পদে পদোন্নতি পান। এ সময় তাঁকে একটি প্রকল্পের পরিচালক পদের জন্য সুপারিশ করা হলে তিনি ‘প্রযুক্তিতে স্বচ্ছন্দ নন এবং শারীরিক অসুস্থতা’র কারণ দেখিয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন।

অথচ ২০২১ সালে জাকির হাসানকে ডিজিটাল সেবার প্রতিষ্ঠান নগদের তদারকির দায়িত্ব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন।

জাকির হোসেন ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) পদে রয়েছেন। এর পাশাপাশি গত ৩০ মার্চ থেকে তিনি অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) পদের দায়িত্বও পালন করছেন।

কোনো ধরনের অনিয়মে নিজের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন জাকির হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব সময়ে নগদের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ দেওয়া হয়েছে, তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তারিকুজ্জামান আত্মীয় হলেও তাঁর ব্যবসার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ডিস্ট্রিবিউটরশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাইনি।’

মামলায় উত্তরার বাড়ির ঠিকানা ব্যবহারের প্রসঙ্গে জাকির হাসান বলেন, ‘আমার বাড়ির নিচতলায় বেশ কয়েকজন ভাড়া নিয়ে থাকত। তারা নগদের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, সেটা আমি জানতাম না।’

জাকির হাসান নূরের বিষয়টিকে সম্ভাব্য ‘প্রিয়তোষণ’ হিসেবে দেখছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু তিনি ডাক বিভাগের কর্মকর্তা এবং তাঁর মামাতো ভাই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিয়েছে, বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত ছিল। তবে তাঁর ভাইকে কোনো অনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।’

এসব বিষয়ে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জাকির হাসানকে নিয়ে এমন কোনো অভিযোগ তাঁর কাছে কেউ করেনি।