বাংলাদেশ

নির্বাচন ঘিরে গোপালগঞ্জসহ চার জেলায় বাড়তি নজর পুলিশের

January 28, 2026
6 months ago
By SAJ
নির্বাচন ঘিরে গোপালগঞ্জসহ চার জেলায় বাড়তি নজর পুলিশের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গোপালগঞ্জসহ চার জেলায় পুলিশের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ভোটের আগে ও ভোটের দিন নাশকতা, সহিংসতা এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির আশঙ্কায় এসব এলাকাকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুর জেলায় অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা এবং পরে গত বছরের জুলাইয়ে এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এই চার জেলায় ভোটারদের কেন্দ্রে আসা ঠেকাতে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছে। এ কারণে নির্দিষ্ট এই জেলাগুলোর অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের আশপাশে বহিরাগতদের চলাচল, রাজনৈতিক কর্মীদের তৎপরতা এবং সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি চার জেলার পুলিশ সুপাররা (এসপি) এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করছেন। সেসব পরিকল্পনা পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি), গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইউনিটগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বৈঠকও করছে পুলিশ। এর সঙ্গে গোপালগঞ্জ-সংলগ্ন হওয়ায় এই চার জেলার বাইরে খুলনা ও বাগেরহাট জেলা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।

ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা কোথাও কোথাও কেন্দ্র দখলের মতো পরিস্থিতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এবার দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকেও নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে-পরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও পরিবহন চলাচল ঝুঁকিমুক্ত রাখতে টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত দুটি বড় ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ভোটের আগে বা ভোটের দিন হঠাৎ নাশকতামূলক ঘটনা ঘটিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা। এতে বিস্ফোরণ, আগুন, ককটেল বা সহিংস হামলার মতো ঘটনা থাকতে পারে—যার উদ্দেশ্য হবে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাঁদের সমর্থকদের দ্বারা ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা। এর মধ্যে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ভোটারদের ভয় দেখানো কিংবা সংঘর্ষ সৃষ্টির মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।

পাশাপাশি নির্বাচনের আগে গুপ্ত হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এ জন্য নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে টহল, তল্লাশিচৌকি, মোবাইল প্যাট্রল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। সারা দেশে পেশাদার সন্ত্রাসী এবং ভাড়াটে কিলার ও শুটারদের গ্রেপ্তারে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) বিভিন্ন সময়ে শুটার ও ভাড়াটে খুনিদের একটি তালিকা করে সারা দেশে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোতে পাঠিয়েছে। তালিকায় কেবল রাজধানীর এমন ১০৩ জনের নাম রয়েছে। গত ১০-১৫ বছরে বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় এদের নাম এসেছে।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, নির্বাচনে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোয় ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ক্যামেরায় সিম কার্ড সংযুক্ত থাকবে। কোনো ভোট কেন্দ্রে গোলমাল শুরু হলে এসওএস বা জরুরি বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে এসব ক্যামেরা থেকে সরাসরি ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। সার্বক্ষণিক লাইভ ছবি ও ভিডিও দেখার ব্যবস্থা আছে। বাকি প্রায় ১০ হাজার ক্যামেরা থাকবে অফলাইন। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও পরে প্রয়োজনে যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে।

এই ক্যামেরাগুলোর বিতরণ ও ব্যবহারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি)। তাঁদের তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত হবে কোন কেন্দ্রে কতটি ক্যামেরা যাবে, কোথায় অনলাইন আর কোথায় অফলাইন ব্যবস্থাটি ব্যবহার করা হবে। স্থানীয় ঝুঁকি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি থানা, জেলা ও রেঞ্জ ডিআইজি বা মেট্টোপলিটন এলাকায় কমিশনারের কার্যালয়ে মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যাতে যার যার এলাকার ক্যামেরাগুলো মনিটর ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেরা ব্যবস্থা নিতে পারে।

ভোটের নিরাপত্তায় শুধু ক্যামেরা নয়, ৫০০ ড্রোন ও ৫০টির মতো ডগ স্কোয়াড থাকবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে ২১ হাজার ৯৪৬টি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি জেলায় এমন কেন্দ্রগুলোতে শতভাগ সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এর বাইরে দেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬ হাজার ৫৫২টি কেন্দ্রে আগে থেকেই সিসি ক্যামেরা ছিল। এসবের সঙ্গে সারা দেশে বিদ্যুৎ-সংযোগবিহীন ২৯৯টি ভোটকেন্দ্রে সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অপরাধ করে যেন কেউ অস্বীকার করতে না পারে, এ জন্য ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এতে করে কোনো অভিযোগ এলে বা কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ফুটেজ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’

ডিজিটাল নজরদারির জন্য আনা সরঞ্জাম পরিচালনাসহ নির্বাচনে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের মতো সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্যই থাকবেন দেড় লাখ। সেনাবাহিনীর সদস্য থাকবেন এক লাখের বেশি। আর নৌবাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি ও বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জনের বেশি সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া বিজিবি, র‍্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও থাকবেন ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্বে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর তাঁরা আরও সাত দিন মাঠে থাকবেন। নির্বাচনসংক্রান্ত মাঠপর্যায়ের যাবতীয় বিষয়ে ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল নজরদারি করা হবে। বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যুক্ত হওয়া যাবে। এর মাধ্যমে সব ঘটনা রেকর্ড করা যাবে। ভোটের দিন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সবকিছু তদারকি করা হবে।

নির্বাচন ঘিরে আরেকটি বড় নিরাপত্তা ইস্যু হচ্ছে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে প্রার্থীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তার আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে তিন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কিছু প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে সার্বক্ষণিক গানম্যান। কারও বাড়িতে রাখা হয়েছে পুলিশ প্রহরা। আবার যাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে গানম্যান ও বাসাবাড়ির নিরাপত্তার পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে পুলিশ প্রটোকলের গাড়ি।

পুলিশ সূত্র জানায়, অন্তত ১৮ জন প্রার্থীকে এই ধরনের বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে যেসব ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বা যাদের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষ নেতাকে গানম্যান ও বাসাবাড়ির নিরাপত্তার পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে পুলিশ প্রটোকলের গাড়ি। এ ছাড়া ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ববি হাজ্জাজের নিরাপত্তায় গানম্যান দেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারাকে গানম্যানের পাশাপাশি পুলিশ প্রটোকলের গাড়িও দেওয়া হচ্ছে।

এবারের জাতীয় নির্বাচনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ জন্য নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) প্রতি সাত দিনে অন্তত একবার মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং জেলার পুলিশ সুপারদের নিয়ে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বৈঠক করছেন। এ বৈঠকগুলোতে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং নিরাপত্তাঘাটতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলার প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, তা সরাসরি জানানো হচ্ছে আইজিপিকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি বাহারুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসা, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেওয়া এবং নিরাপদে ঘরে ফেরা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আর এটি নিশ্চিত করতে নির্বাচনের আগে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি না হয়, আমরা সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। সব নিরাপত্তা পরিকল্পনা সেভাবেই সাজানো হচ্ছে।’