বাংলাদেশ

অবশেষে স্বজনের খোঁজ মিলল, তবে ঘরে ফেরা হলো না নাইমার, দাফন পাবনাতেই

January 10, 2026
3 months ago
By SAJ
অবশেষে স্বজনের খোঁজ মিলল, তবে ঘরে ফেরা হলো না নাইমার, দাফন পাবনাতেই

অবশেষে পাবনার মানসিক হাসপাতালে মারা যাওয়া নাইমা চৌধুরীর স্বজনদের দেখা মিলেছে। তাঁর বড় ভাই মো. হাবিব উল্লাহ চৌধুরী এবং এক ভাগনে ফয়েজ ইবনে জাফর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লাশ বুঝে নিয়েছেন। তবে নাইমা চৌধুরীর আর বাড়ি ফেরা হলো না। তাঁকে পাবনাতেই হাসপাতালের কাছে এক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

৯ জানুয়ারি প্রথম আলো অনলাইনে ‘নাইমা চৌধুরীর জীবনের ১৭টি বছর কাটল পাবনা মানসিক হাসপাতালে, মারাও গেলেন সেখানেই’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

গতকাল (১০ জানুয়ারি) রাত ১০টার দিকে মোবাইলে কথা হয় নাইমা চৌধুরীর বড় ভাই হাবিব উল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবারের সবাই বললেন, লাশকে আর কষ্ট দেওয়ার দরকার নাই, তাই ঢাকায় আনি নাই। লাশে বরফ দেওয়া ছিল। পাবনাতেই হাসপাতালের কাছে এক কবরস্থানে দাফন করছি।’

মানসিক হাসপাতালে নাইমা চৌধুরীর ভর্তির নথিটি অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর পাবনার মানসিক হাসপাতালে নাইমা চৌধুরীকে স্বজনেরা ভর্তি করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। এর পর থেকে ১৭টি বছর এ হাসপাতালের চারদেয়ালের ভেতরেই কেটেছে তাঁর। স্বজনেরা কেউ তাঁকে নিতে আসেননি। খোঁজ নেননি। অবশেষে গত সোমবার এ হাসপাতালেই মারা গেছেন তিনি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় হাসপাতালের মর্গে লাশটি রাখা ছিল। স্বজন পাওয়া না গেলে নাইমা চৌধুরীকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করার কথা ছিল।

বোন মারা গেছে এ তথ্য কোথা থেকে জানলেন জানতে চাইলে হাবিব উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এটা সত্য কথা, প্রথম আলোর খবর না দেখলে জানতাম না বোনটা মারা গেছে। এক খালাতো ভাই ফোন দিয়ে বলছিল, ছোট বোন মারা গেছে, সে খবর জানি কি না। পরে প্রথম আলোর অনলাইনের নিউজটা দেখি। তখন কলিজাটা ছিঁড়ে গেছে।’

কত বছর পর বোনের খোঁজ নিলেন বা এর আগে বোনের খোঁজ নেননি কেন জানতে চাইলে হাবিব উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি অসুস্থ। আমার কিডনির সমস্যা। দিনে ১৩টা ওষুধ খাওয়া লাগে। টাকাপয়সাও নাই। তবে এই বোনের পেছনে একসময় লাখ লাখ টাকা খরচ করছি। ঢাকার বড় বড় ডাক্তার দেখাইছি।’

ভর্তির নথিতে থাকা হাবিব উল্লাহ চৌধুরীর মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ, তা–ও স্বীকার করলেন। বলেন,‘পাবনার হাসপাতালে বোনরে ভর্তির পর একবার বাড়ি আনছিলাম। তারপর উল্টাপাল্টা করলে আবার ভর্তি করাই।’

কত বছর ধরে বোনের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, তা ঠিকভাবে এখন আর মনে করতে পারেন না হাবিব উল্লাহ চৌধুরী। জানালেন, তাঁরা দুই ভাই পাঁচ বোন ছিলেন। বড় ভাই মারা গেছেন। সবার ছোট বোন নাইমাও মারা গেলেন।

বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মোবাইলে কথা হয়েছিল হাসপাতালটির একাধিক চিকিৎসক ও নার্সের সঙ্গে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর আগেও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নাইমা চৌধুরী এবং তাঁর মতো দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকা অন্যদের স্বজনদের খোঁজে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। অনেককে ভর্তির সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির সময় অভিভাবক বা স্বজনের দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও আর সচল নেই অনেকের ক্ষেত্রে।

নাইমার সিজোফ্রেনিয়া ছিল। খাবার খেতে চাইতেন না। হিমোগ্লোবিন কমে যেত তাঁর। হাসপাতালের নথিতে নাইমার বাবার নাম উল্লেখ করা ছিল মজিবুল হক চৌধুরী। তিনি এবং নাইমা চৌধুরীর মা মারা গেছেন। নথিতে ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের আশ্রাফবাদের আহসানবাদ গ্রামের ঠিকানা দেওয়া ছিল।

হাবিব উল্লাহ চৌধুরী জানালেন, বহু আগেই সেখানকার জমিজমা বিক্রি করে তাঁরা এলাকা ছেড়েছেন। বর্তমানে হাবিব উল্লাহ রাজধানীর বাড্ডায় থাকেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত নিউমার্কেটে তাঁর দোকান ছিল। তারপর আস্তে আস্তে ব্যবসায় লোকসান হতে থাকে। নাইমা চৌধুরীর লাশ দাফনসহ যাতায়াত বাবদ যে খরচ হয়েছে, তা–ও মানুষের কাছ থেকে ধার করে নিয়ে গেছেন বলে জানালেন। কামরাঙ্গীরচরে সম্পত্তি কেমন ছিল, তা আর স্পষ্ট করে বললেন না হাবিব উল্লাহ চৌধুরী।

নাইমার মতো হাসপাতালে থাকা এমন ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া ও পুনর্বাসনের জন্য ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেজবাহুল ইসলাম।

হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মো. সেলিম মোরশেদ আজ প্রথম আলোকে বলেন, জীবিত থাকার সময় অনেকেই হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে থাকা স্বজনের খোঁজ নিতে আসেন না। তবে মারা যাওয়ার পর কোনো কোনো স্বজন আসেন। মৃত্যুসনদটা না পেলে ওয়ারিশসংক্রান্ত ঝামেলার কথা চিন্তা করেই হয়তো তখন স্বজনেরা আসেন। নাইমা চৌধুরীর স্বজনদেরও প্রথমে খোঁজ পাওয়া যায়নি। অবশেষে তাঁর স্বজনদের দেখা মিলল।