জীবনযাপন

ওকালতি ছেড়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এখন ফলোয়ার ৩৫ লাখ

January 31, 2026
4 months ago
By SAJ
ওকালতি ছেড়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এখন ফলোয়ার ৩৫ লাখ

মাস তিন আগে ফেসবুকে একটি ভিডিও আমার সামনে আসে। এই আধুনিক যুগেও গরু দিয়ে হালচাষ করছেন একজন বয়সী কৃষক। আর ঘুরে ঘুরে তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন শার্ট-প্যান্ট পরা একজন মানুষ, জানতে চেষ্টা করছেন তাঁর কৃষকজীবনের সুখ-দুঃখের গল্প। ভিডিওটি দেখে কখন যে হাতের আঙুল ‘লাইক’ আইকনটি স্পর্শ করেছে, টেরই পাইনি।

এরপর ফেসবুক খুললে ওই মানুষটার আরও ভিডিও আসতে থাকে। যখনই সময় পাই, দেখি, মুগ্ধ হই। একসময় মানুষটার নামধামও জানা হয়ে যায়—ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর জুয়েল রানা। কৃষি ও প্রকৃতির সঙ্গে জীবনবোধের মিশ্রণ ঘটিয়ে ভিডিও বানান তিনি। ফেসবুকে ‘চিত্ত মিডিয়া’ নামে তাঁর একটা পেজও আছে। সেখানে এখন পর্যন্ত তাঁর ভিডিওর সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০। প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে ভিডিও আপলোড করেন।

কত ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’–জাতীয় বিষয় নিয়েই না ভিডিও বানিয়েছেন জুয়েল রানা। একটা ভিডিওতে দেখা যায়, মাছের ঘেরের ওপর বাঁশ দিয়ে বানানো ছোট্ট কুঁড়েঘর। সূর্য অস্তাচলে যাওয়ার সময় হয়েছে। এমনই গোধূলিবেলায় সেখানে বসে ডানা শুকাচ্ছে একঝাঁক পানকৌড়ি। তাদের সঙ্গী একটি সাদা বক।

এমন দৃশ্য পেছনে রেখে ভিডিওতে কথা বলছেন জুয়েল রানা। লাজুক স্বভাবের পাখিটি নিয়ে আল মাহমুদের বিখ্যাত ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বাংলা সাহিত্যের গল্প–কবিতা কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করছেন। ডানা শুকানো শেষে কোনো এক বাঁশবাগানে, ওদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে পাখি—এমন দৃশ্য দিয়ে ভিডিওটি শেষ হয়েছে।

আরেকটা ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে হেলে পড়ে আছে একটি খেজুরগাছ। হয়তো আচমকা কোনো ঝড় গাছটির এই দশা করেছে। কিন্তু জমির মালিক গাছটি কেটে ফেলেননি। আর গাছটিও বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে প্রাণান্ত। এই পৌষ-মাঘ মাসে ফোঁটা ফোঁটা মিষ্টি রসও দিচ্ছে। এ গাছটি নিয়ে ভিডিও বানিয়ে জুয়েল রানা বলছেন, ‘টিকে থাকার ইচ্ছাটা আগে নিজের থাকতে হবে।’

তাঁর এসব ভিডিও দেখতে দেখতে একদিন মনে হলো, মাটি ও মানুষের প্রতি এমন দরদি মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হওয়া দরকার। এভাবেই জুয়েল রানার গল্প জানার চেষ্টা।

২০১৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন জুয়েল রানা। পড়াশোনা শেষ করে বছর চারেক ওকালতির চেষ্টা করেন। আর দশজন বাবার মতো তাঁর কৃষক বাবাও চেয়েছিলেন ছেলে চাকরিবাকরি করুক, প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু জুয়েল মনে করলেন, চাকরি তাঁর জন্য নয়, এমনকি ওকালতিও না।

তাঁর মনে অনবরত প্রশ্ন, জীবনের তৃপ্তি কোথায়? একদিন মনে হলো, মাটি ও মানুষের কথা, কৃষকের কথা, গাছের কথা বলতে পারলে জীবন সার্থক হতো। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিল ‘চিত্ত মিডিয়া’। আর চার দিন পরই তাঁর পেজের বয়স হবে এক বছর। এই এক বছরেই ফেসবুকে ‘চিত্ত মিডিয়া’র ফলোয়ার ৩৫ লাখ। ইউটিউবে প্রায় এক লাখ সাবস্ক্রাইবার।

বাবা কৃষক হওয়ায় জন্ম থেকেই কৃষি ও প্রকৃতির সঙ্গে জুয়েলের পরিচয়। ফসলের রং পরিবর্তন, ঋতুর ছন্দ—এসব প্রাকৃতিক শিক্ষা ছোটবেলাতেই পেয়েছেন। ভিডিওতে এসবই তুলে ধরেন। জুয়েলের ভাষায়, ‘কৃষকের গল্প, সমস্যা ও ঋতুবৈচিত্র্য তুলে ধরলে কৃষি হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত শিল্প।’ জ্ঞান দেওয়া ও বিনোদনের পাশাপাশি কৃষকের জীবন ঘিরে এক দার্শনিক বোধ তৈরি করতে চান তিনি।

ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গাসহ ওই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ ঘুরতে ঘুরতে যখনই ভিডিও তৈরির উপাদান পান, কাজে নেমে পড়েন জুয়েল ও তাঁর টিমের দুই সদস্য ইকরামুল কবির ও হাসানুজ্জামান। ভিডিওতে প্রকৃতির সুর ব্যবহার করেন জুয়েল রানা। তাঁর কথায়, ঘুঘু পাখির ডাক নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন একবেলা, শেয়ালের ডাক নেওয়ার জন্য মাঠের মধ্যে বসে থেকেছেন অনেক রাত অবধি।

তাঁর মতে, ভিডিও তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রামবাসীর বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন এবং পরিবেশ। গ্রামের মানুষ ক্যামেরার সামনে কথা বলতে ভয় পান। তাই তাঁদের জীবনবোধের সুন্দর দিকগুলো ক্যামেরায় তুলে ধরা সহজ নয়।

প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন জুয়েল রানা। দর্শকদের মধ্যে কেউ যখন বলেন যে ভিডিও দেখে শৈশবের গ্রামীণ জীবন মনে পড়ে, তখন নিজেকে সার্থক মনে করেন জুয়েল।

এ কাজটিই করে যেতে চান জুয়েল। তাঁর কথায়, সবাই যদি চাকরি করে, তাহলে পৃথিবীর রূপ-রসের বর্ণনা করবে কে! এর জন্য তো দু-একটা পাগল থাকা চাই!

স্ত্রী নিশা ও তিন বছরের কন্যা জেসিকে নিয়ে জুয়েল রানার সংসার ঝিনাইদহ শহরে। বাবা-মা ও একটি বোন গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

গ্রামীণ জীবন, কৃষকের গল্প আর প্রকৃতির ভাষা মিলিয়ে জুয়েল রানা গড়ে তুলছেন এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে একসঙ্গে উপস্থিত মানবিকতা, শিক্ষা আর বিনোদন। তাঁর কাজ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি প্রয়াস।