বাংলাদেশ

অস্ত্রোপচার থেকে যক্ষ্মা ছড়াচ্ছে

September 5, 2026
1 month ago
By SAJ
অস্ত্রোপচার থেকে যক্ষ্মা ছড়াচ্ছে

অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসবের বেশ কয়েক দিন পরও জয়া রানী দাসের ক্ষতস্থান শুকায়নি। চিকিৎসকেরা একের পর এক ওষুধ দেন, ক্ষতস্থান ভালো হয় না। একদিন পরীক্ষায় জানা গেল, ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা। যক্ষ্মার কারণে ক্ষত শুকাচ্ছে না। আরও পরে জানা গেল, শুধু জয়া রানী একা নন, একই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হওয়া অন্তত ১২ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ঘটনা জানতে তদন্তে নেমেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ঘটনাটি পাবনার ফরিদপুর উপজেলা সদরের আল–মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটালে। এই হাসপাতালে গত মে–জুন মাসে প্রায় ১২০ জন প্রসূতির প্রসব হয় অস্ত্রোপচারে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন প্রসূতি হাসপাতাল থেকে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হওয়া এক ব্যক্তিরও ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা ধরা পড়েছে। তবে যক্ষ্মাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের সময় যক্ষ্মার সংক্রমণ নতুন ঘটনা নয়। তবে পাবনার মতো ঘটনা বড় মনে হচ্ছে।

জয়া রানী দাসের বাড়ি উপজেলা সদরের থানাপাড়া এলাকায়। বয়স ২০ বছরের কাছাকাছি। ২২ মে তাঁকে আল–মদিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিনই অস্ত্রোপচারে তাঁর সন্তানের জন্ম হয়। ২৪ মে হাসপাতাল থেকে সন্তানসহ বাড়ি ফেরেন জয়া। ২৯ মে হাসপাতালে গিয়ে সেলাই কাটাসহ ক্ষতস্থান ড্রেসিং করে বাড়ি ফেরেন। চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খান, ব্যবস্থাপত্র মেনে চলেন। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পরও পেটের ক্ষতস্থান শুকায়নি।

গত ৩০ আগস্ট জয়া রানী ও তাঁর মা–বাবার সঙ্গে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলেন, অস্ত্রোপচারের পুরো জায়গা শুকাচ্ছিল না। পুঁজ জমতে থাকে, রস বের হতে থাকে। জয়া একাধিকবার হাসপাতালে যান। চিকিৎসক ওষুধ দেন; কিন্তু ক্ষত শুকায় না।

একপর্যায়ে ক্ষতস্থান থেকে মাংসের নমুনা রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। পাশাপাশি জয়া রানীকেও রাজশাহীতে পাঠানো হয়। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষায় ক্ষতস্থানে যক্ষ্ম শনাক্ত হয়। এরপর দ্রুতই জয়াকে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে যক্ষ্মার ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কাগজপত্রে দেখা যায়, ২৫ জুলাই থেকে জয়া রানী দাস যক্ষ্মার ওষুধ খাওয়া শুরু করেন।

এ ঘটনাকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রাশেদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এই হাসপাতালে মে–জুনে অস্ত্রোপচার হয়েছে, এমন ১২ জনের পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজনের গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। অন্য ১১ জনের অস্ত্রোপচারে প্রসব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যক্ষ্মার উৎস শনাক্ত করা কঠিন এবং তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

ওই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, তাঁরা তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। আল–মদিনা হাসপাতালের অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখা হয়েছে, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে এবং সংক্রমণের কারণ অনুসন্ধানে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কিছুটা পুরোনো। অস্ত্রোপচার আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে ঘটনাটি জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি যথাযথ অনুসন্ধানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদসহ আইইডিসিআর ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আসিডিডিআরবি) একটি দল গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় পাবনায় পৌঁছায়।

যক্ষ্মা প্রধানত ফুসফুসের রোগ। ফুসফুসের রোগ হওয়ার কারণে কাশির সঙ্গে যক্ষ্মার সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র বলছে, ফুসফুস ছাড়াও শরীরের অন্য বেশ কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যক্ষ্মা হয়। এসব যক্ষ্মাকে বলা হয় ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা বা এক্সট্রা–পালমুনারি টিবি। ক্ষতস্থানে যে যক্ষ্মা হচ্ছে, সেটিও ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা। এ যক্ষ্মার চিকিৎসায়ও নিয়মিতভাবে প্রতিদিন যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করতে হয়। সরকার এ ওষুধ বিনা মূল্যে দেয়। জয়া রানী দাসও সরকারি কর্মসূচি থেকে দেওয়া ওষুধ সেবন করছেন।

আল–মদিনা হাসপাতালটি ফরিদপুর উপজেলা সদরের তেঁতুলতলা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে। কমপ্লেক্স ভবনের নিচতলা ও দোতলা নিয়ে হাসপাতালটি। ৩০ আগস্ট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ রানা, অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ইনচার্জ মো. আরিফুল ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

এটি ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১০ শয্যার হাসপাতাল চালাতে কমপক্ষে স্থায়ী তিনজন চিকিৎসক, ছয়জন নার্স, লেবার রুম, ওটি, ৮০০ বর্গ ফুটের ওয়ার্ড, ইমার্জেন্সি রুম—এসব থাকতে হবে। এসব শর্ত পুরোপুরি না মেনেই হাসপাতালটি চলছে ২০২০ সাল থেকে।

ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালে ৮০০ বর্গফুট আয়তনের কোনো কক্ষ নেই। অস্ত্রোপচারকক্ষটি বেশ পরিষ্কার। দেখে মনে হয়, সম্প্রতি ধোয়ামোছা করা হয়েছে। দুটি পুরোনো অটোক্লেভ যন্ত্র পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। দু–এক দিন আগে একটি নতুন অটোক্লেভ যন্ত্র আনা হয়েছে। এক দিনও ব্যবহার করা হয়নি। অস্ত্রোপচারকক্ষের পাশেই স্বাভাবিক প্রসবের একটি কক্ষ। সেটিতে কোনো শয্যা দেখা গেল না।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ রানা জানান, এই হাসপাতালে দৈনিক দু–তিনটি প্রসব হয় অস্ত্রোপচারে। মাসে ৬০ থেকে ৭০টি অস্ত্রোপচার হয়। প্রসবে অস্ত্রোপচারই এই হাসপাতালের আয়ের প্রধান উৎস। তবে কিছু স্বাভাবিত প্রসবও হয়।

প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিটি প্রসব করানোর জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে লেবার রুম প্রটোকল বা প্রসবকক্ষ নির্দেশিকা মেনে চলতে হয়। ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ওটি ইনচার্জ এই প্রতিবেদককে কোনো নির্দেশিকা দেখাতে পারেননি। এমন একটি নির্দেশিকা থাকতে হয়, এটাই তাঁরা জানেন না। তাঁরা দুজনই দাবি করেন, প্রতিটি অস্ত্রোপচারের পর যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা হয়; কিন্তু এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ তাঁরা দেখাতে পারেননি।

ওটি ইনচার্জ মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, যক্ষ্মার সম্ভাব্য উৎস দুটি। কোনো রোগী অথবা ওটি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘আমাদের জন্য এটা অনেক বড় ঘটনা। সংক্রমণের দায় এড়ানো মুশকিল। আমাদেরও জানতে হবে, কীভাবে ঘটনা ঘটল।’

অস্ত্রোপচারকক্ষ এবং অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি যথাযথ জীবাণুমুক্ত না হওয়ার কারণে যক্ষ্মা ছড়ানোর ঘটনা ঘটছে। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুর জেলায় ভেদরগঞ্জ উপজেলার মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকে প্রসবে অস্ত্রোপচারের সময় বেশ কিছু প্রসূতির শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটে। জুন মাসে ওই ঘটনা যৌথভাবে তদন্ত করে আইইডিসিআর ও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। তারা ঘটনার সত্যতা পায়।

গতকাল ভেদরগঞ্জ উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার হওয়া ৫১ জনের শরীরে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল। মার্চ মাস থেকে ক্লিনিকটি এবং ক্লিনিকের অস্ত্রোপচারকক্ষ বন্ধ আছে। তবে ডায়াগনস্টিক সেবাটি চালু রাখা হয়েছে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা পাবনা ও শরীয়তপুরের দুটি উপজেলার ঘটনা জানেন। এর বাইরের কোনো ঘটনা ঘটছে বলে তাঁদের জানা নেই।

তবে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত একটি বিদেশি সংস্থার একজন কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা উত্তরবঙ্গের চারটি জেলার চারটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছেন, ওই হাসপাতালগুলো প্রায় নিয়মিতভাবে ক্ষতস্থানে যক্ষ্মার রোগী পাচ্ছেন।

‘এসব শুনলে ভয়ই লাগে’—এমন মন্তব্য করেন জ্যেষ্ঠ প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রওশান আরা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আগে শুনছি, ল্যাপারেস্কোপি (পেট না কেটে পেট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার) করার সময় যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটেছে। এখন শুনছি, অস্ত্রোপচারে শিশুর জন্মের সময় এটা ঘটছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের যে দেশগুলোয় যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। দেশে প্রতিবছর সাড়ে তিন লাখের মতো মানুষ নতুন করে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। বছরে যত মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়, তাদের সবাই শনাক্ত হয় না। যারা শনাক্ত হয়, তাদের সবাই চিকিৎসা পায় না। যারা চিকিৎসা নেয়, তারা সবাই ভালো হয় না। বছরে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ যক্ষ্মায় মারা যায়।

প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এমন যক্ষ্মাবিশেষজ্ঞ, প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞ, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পাবনা ও শরীয়তপুরের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগকে বিষয়টির দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে করণীয় ঠিক করা দরকার। আবার মানুষের মধ্যে যেন ভীতি তৈরি না হয়, সেই পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।

বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আসিফ মুজতবা মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবহারের আগে হাসপাতালের অস্ত্রোপচারকক্ষ ও যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া ঠিকমতো প্রতিপালিত হচ্ছে, এটা নিশ্চিত করতে হবে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সরোয়ার মোর্শেদ, পাবনা)