খেলা

পকেট কাটছে ফিফা ও আয়োজকরা: বিশ্বকাপে ট্রেনের টিকিটের দাম ১৮ হাজার টাকা

April 18, 2026
12 hours ago
By SAJ
পকেট কাটছে ফিফা ও আয়োজকরা: বিশ্বকাপে ট্রেনের টিকিটের দাম ১৮ হাজার টাকা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালসহ মোট আটটি ম্যাচের ভেন্যু নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম। কিন্তু সেখানে যেতে হলে নিউইয়র্ক থেকে ট্রেনে আসা-যাওয়ার জন্য গুনতে হবে ১৫০ ডলার — বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৩ টাকা। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে যা ১০ গুণেরও বেশি। গত শুক্রবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই ভাড়া ঘোষণা করার পর থেকেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

সাধারণ দিনে নিউ জার্সি থেকে নিউইয়র্ক সিটির এই ৫৬ কিলোমিটার পথের আসা-যাওয়ার ভাড়া মাত্র ১২ ডলার ৯০ সেন্ট। বিশ্বকাপের সময় সেই একই পথে ভাড়া লাফিয়ে উঠেছে ১৫০ ডলারে। এনজে ট্রানজিটের প্রেসিডেন্ট ও সিইও ক্রিস কোলুরি জানান, ‘আমাদের সিস্টেমে ফিরতি টিকিটের জন্য আমরা ১৫০ ডলার নেব। অর্থাৎ নিউইয়র্ক থেকে মেটলাইফ এবং মেটলাইফ থেকে পুনরায় নিউইয়র্ক ফেরার ভাড়া হবে এটি।’

এনএফএলের নিউইয়র্ক জেটস ও জায়ান্টসের ঘরের মাঠ এই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের জন্য মাত্র ৪০ হাজার ট্রেন টিকিট বরাদ্দ থাকবে। তবে ট্রেনের বাইরে নিজের গাড়িতে গেলেও রেহাই নেই। ‘জাস্ট পার্ক’ সাইটের তথ্য বলছে, প্রতিবন্ধী দর্শকদের জন্য সীমিত পার্কিং সুবিধা রাখা হয়েছে, তাতে গুনতে হবে ২২৫ ডলার। সাধারণ সমর্থকদের গাড়ি পার্ক করতে হবে পাশের একটি শপিং মলে — খরচ সেখানেও একই।

এই পরিস্থিতিতে নিউইয়র্কের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী গাই ডিকসন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি মনে করি এটি চরম লজ্জার একটি বিষয়। স্রেফ ভক্তদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।’

দোষটা কার? এই প্রশ্নে শুরু হয়েছে তীব্র বাদানুবাদ।

নিউ জার্সির নবনির্বাচিত গভর্নর মিকি শেরিল গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজেদের পরিবহন সংস্থার পক্ষ নিয়ে লেখেন, ‘বিশ্বকাপে দর্শকদের যাতায়াত বাবদ ফিফা এক পয়সাও খরচ করেনি।’ তাঁর দাবি, ফিফা ও নিউ জার্সির সাবেক নেতৃত্বের মধ্যকার চুক্তির কারণে স্টেডিয়ামের পার্কিং ব্যবস্থা বাতিল করতে হয়েছে। ফলে রেল পরিষেবাকে আগের চেয়ে চারগুণ বেশি যাত্রী বহন করতে হচ্ছে। শেরিল আরও জানান, এই চুক্তির কারণে এনজে ট্রানজিটের অন্তত ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার খরচ হবে, অথচ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার।

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর সিনেটের সংখ্যালঘু দলের নেতা চাক শুমারও সরব হন। তিনি লেখেন, ‘বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোর যাতায়াত খরচ ফিফারই বহন করা উচিত।’

ফিফা অবশ্য ম্যাচের টিকিটের চড়া দাম নিয়ে আগে থেকেই সমালোচনায় আছে। এবার নিউ জার্সির এই পদক্ষেপকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি। ফিফার বিশ্বকাপ সংক্রান্ত প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হাইমো শিরগি বলেন, ‘খামখেয়ালিভাবে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে ফিফাকে সেই খরচ মেটানোর দাবি জানানোটা একেবারেই নজিরবিহীন।’ তিনি যোগ করেন, ‘পৃথিবীর অন্য কোনো বৈশ্বিক আয়োজন, কনসার্ট বা বড় কোনো ক্রীড়া সংস্থাকে এমন দাবির মুখে পড়তে হয়নি।’ ফিফার ১১০০ কোটি ডলার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে শিরগি স্মরণ করিয়ে দেন, এটি নিট মুনাফা নয় এবং ফিফা সব সময়ই একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে কাজ করে এসেছে।

ফিফা আগে জানিয়েছিল, স্বাগতিক শহরগুলোর সঙ্গে মূল চুক্তিতে ম্যাচ চলাকালীন ভক্তদের ‘বিনামূল্যে যাতায়াতের’ শর্ত ছিল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এটি দেখাও গিয়েছিল—দর্শকেরা ম্যাচের টিকিট দেখিয়ে দোহা মেট্রোতে বিনামূল্যে যাতায়াত করেছেন। পরবর্তী আলোচনায় শর্ত বদলে ‘নামমাত্র মূল্যে’ যাতায়াতের কথা বলা হয়েছিল।

ফ্রান্সের সমর্থক সংগঠন ‘ইরেজিস্টেবল ফ্রঁসে’র মুখপাত্র গুইলাম অপ্রেতে এই আকাশচুম্বী দামকে বলেছেন ‘পুরোপুরি পাগলাটে।’ তাঁর কথায়, ‘প্রতিদিন যাতায়াত নিয়ে কোনো না কোনো দুঃসংবাদ আসছে। আপনি ভেবে অবাক হবেন, এই পাগলামি কোথায় গিয়ে থামতে পারে।’

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলও ছাড়েননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘একটি ছোট ট্রেন ভ্রমণের জন্য ১০০ ডলারের বেশি দাবি করাটা আমার কাছে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।’

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, যাতায়াত ব্যবস্থার খরচ সামলাতে মার্কিন ফেডারেল ফান্ড থেকে আয়োজক শহরগুলোর জন্য ১০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি পাচ্ছে ১ কোটি ৪ লাখ, বোস্টন ও ম্যাসাচুসেটস পাচ্ছে ৮৭ লাখ ডলার।

ইংল্যান্ডের ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএসএ) প্রধান থমাস কনক্যানন বিবিসিকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এই টুর্নামেন্ট নিয়ে যা কিছু সামনে এসেছে, তার সবটাই ভক্তদের পকেট কাটার ফন্দি।’ তিনি যোগ করেন, ‘একটি ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য যে খরচ হতে পারে, সেই তুলনায় এ দাম নিশ্চিতভাবেই আকাশচুম্বী। আমরা এভাবে পকেট কাটার শিকার হতে প্রস্তুত নই।’