আন্তর্জাতিক

প্রচারে এবার বিজেপির কৌশল বদল, তবু তৃণমূলই এগিয়ে

April 19, 2026
8 hours ago
By SAJ
প্রচারে এবার বিজেপির কৌশল বদল, তবু তৃণমূলই এগিয়ে

‘বিজেপি এবারে ভুল করছে একটু কম,’ পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মইদুল ইসলামের। এই ‘কম ভুল’ করাটা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যজয়ের লক্ষ্যে বিজেপির প্রচারকৌশল পরিবর্তনের দিকটি নির্দেশ করে।

এক যুগ ধরে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যও কবজায় আনতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই চেষ্টায় এবার গোছালো তৎপরতাই দেখছে পর্যবেক্ষক মহল।

এত সবের পরও অবশ্য তৃণমূল কংগ্রেসকেই এগোনো দেখা যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রাক্‌নির্বাচনী জনমত জরিপে। যার অর্থ দাঁড়া্য়, দেড় দশক ধরে রাজ্যে ক্ষমতাসীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হটানোর পথটি এখনো কঠিনই আছে।

ভারতের বাংলাদেশ লাগোয়া রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট গ্রহণ হবে। কে জয়ী হলো, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ৪ মে পর্যন্ত। ২৯৪ আসনের এই বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য যেকোনো দলের প্রয়োজন হবে ১৪৮ আসনে জয়।

২০২১ সালে জয়ের আশাবাদ থাকলেও হতাশা সঙ্গী হয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)। তৃণমূল ২১৫টি আসনে জয়ী হয়, ৭৭টি আসনে জিতে বিরোধী দলের আসন নেয় বিজেপি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার তাদের কৌশল পরিবর্তন স্পষ্ট।

সেই পরিবর্তনগুলো কী কী, তা তুলে ধরলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মইদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেমন আগেরবার তারা মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিল। এবারে এখনো করেনি। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে অনেক আগে নিয়ে এসেছে, প্রশাসনিক স্তরে এত অফিসার বদলিও তারা আগে করেনি।’

জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘অনুপ্রবেশের ন্যারেটিভ’ ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের বরাবরের হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের কৌশলটি কাজে লাগাতেও কৌশলী দলটি।

অধ্যাপক মইদুল ইসলামের ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েক দিন আগেই বললেন, বাঙালিরা আর মুসলমানেরা আলাদা। অর্থাৎ হিন্দু বাঙালির সঙ্গে মুসলমান বাঙালির একটা ফারাক করতে চাইলেন। এসবই তাঁরা করছেন অত্যন্ত ভেবেচিন্তে, যেটা আগে আমরা দেখিনি।’

আবার নরেন্দ্র মোদির সরাসরি প্রচারে না নামাটাও দৃশ্যমান। ২০২১ সালের নির্বাচনের সময় তিনি ২০টির বেশি সমাবেশ-মিছিল করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে এসে। এবারে তা কয়েকটিতে সীমাবদ্ধ ছিল।

এর কারণ কী? বিজেপির নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেল, ভবিষ্যৎ লোকসভা নির্বাচন মাথায় রেখে রাজ্যগুলোর নির্বাচনে মোদিনির্ভরতা কমাতে চাইছে বিজেপি। কেন্দ্র থেকে এমন সিদ্ধান্ত এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির প্রচার দলের এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিরোধিতার হাওয়া আছে, তেমনি ভারতে একটা হাওয়া রয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে। আমরা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই এটা দেখেছি। সেবারে বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।

‘২০২৯-এ আবার লোকসভা নির্বাচন রয়েছে। সেই নির্বাচনেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন মোদি। এর আগে প্রচারের অতি ব্যবহারে তিনি যদি জীর্ণ হয়ে যান, তাতে মোটেই লাভ হবে না দলের। একটি রাজ্যে জিততে গিয়ে দেশ হারানো কোনো বুদ্ধির কাজ নয়।’

তবে তৃণমূলঘেঁষা বিশ্লেষকেরা বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, মোদি দ্রুত তাঁর ক্যারিশমা হারাচ্ছেন, সে কারণেই মোদিনির্ভরতা কমাচ্ছে বিজেপি।

প্রচার ও পরিকল্পনায় আরএসএস নেতা

নরেন্দ্র মোদিকে নিরাপদে রেখে দিয়ে এবার হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) গুরুত্বপূর্ণ নেতা সুনীল বনসলকে নির্বাচনী কৌশল ও পরিকল্পনার একেবারে মাথায় বসিয়ে কাজ করছে বিজেপি।

সংঘের অর্থনীতিবিষয়ক শাখা স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের সহ-আহ্বায়ক ধনপত আগরওয়াল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজেপি এবার প্রচার অনেক গুছিয়ে করতে পারছে, কারণ সংঘের প্রচারক সুনীল বনসল পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখছেন। কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে বা হবে না, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে দেখছেন তিনি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই, এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। অনেকেই চেষ্টা করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে বাইরের বাঙালিও রয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।’

গতবারের নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে যে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন মধ্যপ্রদেশের নেতা কৈলাস বিজয়বর্গী ও তাঁর দল, সেটা অনেকটাই সাহায্য করছে সুনীল বনসল ও তাঁর দলকে।

তবে এসবের মধ্যেও কিছুটা ফাঁক আছে, যার একটি হলো অমিত শাহর সঙ্গে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিরোধ। আদিত্যনাথের জনপ্রিয়তা বিজেপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, অমিত শাহ, যাঁকে এই মুহূর্তে ভারতের ‘রাজনীতির চাণক্য’ বলা হয়ে থাকে, তিনি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী রণকৌশল চমৎকার বুঝলেও দলীয় কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে একটু পিছিয়ে পড়ছেন।

বিজেপি নিয়ে গবেষণা করেন, এমন এক প্রাবন্ধিকের কথায়, ‘সে কারণেই হয়তো পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রচারের জন্য আদিত্যনাথকে রাজ্যে না আনার কথাই গোড়ায় ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনতে হয়েছে দলের নেতা–কর্মীদের চাপে।’

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মাঠপর্যায়ের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, তাঁরা বাইরের যেসব নেতার ভাষণ শুনতে উদ্‌গ্রীব, তাঁদের মধ্যে মোদির পরেই রয়েছেন যোগী আদিত্যনাথ। অমিত শাহর অবস্থান এর পরে।

ফ্যাক্টর যখন অমিত শাহ

তবে শেষ পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই নির্ভর করছে অমিত শাহর ওপরই। তাঁর কাছেই রিপোর্ট করছেন সুনীল বনসল বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব, যিনি রয়েছেন বনসলের একটু নিচে।

মইদুল ইসলাম বলেন, এ রকম তো আগে কখনো হয়নি যে ১৫ দিন ধরে রাজ্যে পড়ে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ। বস্তুত অন্য রাজ্যেও এমনটা হয়েছে কি না, জানা নেই। এর একটা কারণ হতে পারে যে বারবার এই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যাওয়া, এটা বিজেপি নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছে না। ভোট করানো ও জেতা নিয়ে বিজেপির যে গর্ব, সেটা বারবারই ম্লান হয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে।

তৃণমূলের জন্য এর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ভারতবর্ষের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী, যারা রয়েছে অমিত শাহর নিয়ন্ত্রণে।

নির্বাচনের সাত দিন আগে ধারাবাহিকভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে তৃণমূলের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বাড়িতে। বেছে বেছে নির্বাচনী কেন্দ্র এবং বুথ ধরে ধরে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা বাড়ানো এবং কমানো হচ্ছে। কোথায় কত নিরাপত্তাকর্মী পাঠানো দরকার, সে সিদ্ধান্ত অমিত শাহ নিচ্ছেন বলেই রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল নেতারা দাবি করছেন।

মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার বাসিন্দা তৃণমূল কর্মী সুদীপ্ত দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেমন মুসলমান প্রধান মুর্শিদাবাদ জেলায় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী পাঠানো হবে। যদিও ওদের একটা অংশ হলো রাজ্য পুলিশ, তবু এ ধরনের পদক্ষেপ একটা বার্তা দেয় যে বিজেপির পেছনে প্রশাসন রয়েছে, তৃণমূল কর্মীদের পেছনে নেই। নির্বাচনের দিনে এটা তৃণমূল কর্মীদের মনোবলে কিছুটা আঘাত দিতে পারে আর আত্মবিশ্বাসী করতে পারে বিজেপিকে।’

তবু এগিয়ে তৃণমূলই

এত সব প্রচার ও পরিকল্পনা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসকেই এখনো বিজেপির চেয়ে কিছুটা এগিয়েই রেখেছে প্রায় সব কটি প্রাক্‌নির্বাচনী জনমত জরিপ। ২০ শতাংশ জরিপ অবশ্য এগিয়ে রেখেছে বিজেপিকে।

বেশির ভাগ জরিপে তৃণমূল কংগ্রেসকে এগিয়ে রাখার কয়েকটি কারণও রয়েছে।

এক. ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়ার পরও সব দলের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই, জনমত জরিপই বলছে সে কথা। তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর মতো নেতা যে রাজ্য বিজেপিতে নেই, তা রাস্তার ধারে ধারে প্রধানমন্ত্রী মোদির ছবিতেই বোঝা যাচ্ছে। সেখানে ছোট করে রাখা হয়েছে রাজ্যের নেতৃত্বকে, অনেক ক্ষেত্রে হোডিংয়ে শুধুই মোদির ছবি। এখানেই তৃণমূলের প্রশ্ন, বিজেপি জিতলে তাদের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? এ প্রশ্নের উত্তর বিজেপির কাছে নেই।

দুই. যে বিষয়টি বিজেপিকে চাপে রেখেছে সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গে ৮০ হাজারের বেশি নির্বাচনী বুথ রয়েছে। প্রতিটি বুথের তত্ত্বাবধানে যদি পাঁচজন করে দলীয় ভোটকর্মীর প্রয়োজন হয়, তবে চার লাখ স্বেচ্ছাসেবী লাগে। তাঁদের বয়স ২০ থেকে ৪০–এর মধ্যে হওয়া প্রয়োজন। কারণ, কাজটা অত্যন্ত পরিশ্রমের। এত কর্মী কি বিজেপির আছে? গতবার তারা বড়সংখ্যক বুথে কর্মী দিতে পারেনি, যে কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যে বলেছেন যে বিজেপি বুথে এজেন্ট দিতে পারে না, তাই প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে জেতার চেষ্টা করছে।

অবশ্য অমিত শাহ ও তাঁর দলবল এবার এর সমাধানের চেষ্টা করেছেন ভিন্ন উপায়ে। বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা জানাচ্ছেন, দল এবার ঠিকই করে নিয়েছে যে ৮০টির মতো আসনে তারা তৃণমূলের সঙ্গে লড়ার চেষ্টাই করবে না। এর কারণ ওই ৮০টি আসনে মুসলমান ভোট হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ অথবা রয়েছে বিপুল পরিমাণে। এখানে লড়ে শক্তি ক্ষয় না করে বাকি ২১৫টির মতো আসনে সব শক্তি প্রয়োগ করবে বিজেপি। অর্থাৎ শুরু থেকেই ৮০টি আসনে পিছিয়ে থেকে লড়াই শুরু করতে হচ্ছে বিজেপিকে।

খিদিরপুর অঞ্চলের বাসিন্দা বিজেপির কর্মী সুনীল সিং প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিন্তু এ ছাড়া আর উপায় কী? পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার সব সময়ই থাকবেন, সেটা ধরে নিয়েই আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। সেটাই করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সুনীল বনসল।’

পশ্চিমবঙ্গ যেন বিজেপির কাছে এখনো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। ঢেউয়ের মতোই জয় কাছে আসে, আবার দূরে চলে যায়।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির ভোটের ফারাক ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। বিজেপি ধরেই নিয়েছিল পরের বিধানসভা নির্বাচনে, অর্থাৎ ২০২১ সালে তারা জিতছে। অথচ ফারাক বেড়ে ১০ শতাংশ হয়ে গিয়েছিল। এরপর গত লোকসভা নির্বাচনে (২০২৪ সালে) ফারাক কমে দাঁড়ায় ৭ শতাংশে। বিজেপির জয় যেন আসি আসি করেও আসছে না।