প্রখ্যাত ইরানি লেখক ও নির্মাতা মারজানে সাতরাপি মারা গেছেন
ফরাসি-ইরানি শিল্পী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মারজানে সাতরাপি মারা গেছেন। ৩ জুন ৫৬ বছর বয়সী এই শিল্পীর মৃত্যু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, স্বামী ম্যাথিয়াস রিপার মৃত্যুর এক বছরের কিছু বেশি সময় পর সাতরাপি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। অস্কার মনোনীত অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘পার্সেপোলিস’-এর স্রষ্টা হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একজন চলচ্চিত্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক কণ্ঠ।
১৯৬৯ সালে ইরানের রাজধানী তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন সাতরাপি। শৈশবের শান্ত জীবন বদলে যায় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি প্রত্যক্ষ করেন, কীভাবে একটি দেশ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। মেয়েদের পোশাক, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার—সবকিছুর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সাতরাপি পরবর্তী সময়ে বহুবার বলেছেন, তাঁর শিল্পীসত্তা মূলত এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে একজন নারীর মূল্য একজন পুরুষের অর্ধেক বলে ধরা হয়। কিন্তু আমি কখনো মনে করিনি যে আমি কম কিছু।’
কৈশোরে তাঁকে ইউরোপে পাঠানো হয়। কয়েক বছর অস্ট্রিয়ায় কাটানোর পর তিনি আবার ইরানে ফিরে আসেন। কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন, তাঁর চিন্তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। অবশেষে ১৯৯৪ সালে তিনি ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে চলে যান।
প্যারিসে নতুন জীবন শুরু করা সহজ ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের সংকট তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে। কিন্তু এই সংগ্রামই পরবর্তী সময়ে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিশ্বব্যাপী সাতরাপি পরিচিতি পান গ্রাফিক নভেল পার্সেপোলিস দিয়ে। এই আত্মজৈবনিক লেখাটিতে তিনি নিজের শৈশব, ইরানি বিপ্লব, যুদ্ধ, নির্বাসন এবং পরিচয়ের সংকটকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেন। বইটি দ্রুত আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে তিনি ফরাসি নির্মাতা ভিনসেন্ট পারোনোর সঙ্গে যৌথভাবে বইটির অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র রূপ দেন। সাদা-কালো অ্যানিমেশনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কার জিতে নেয়।
সাতরাপির কাজের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কেবল কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। ২০১৯ সালে ‘রেডিও–অ্যাকটিভ’ চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় তিনি হলিউডে নারী পরিচালকদের অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মতে, বড় বাজেটের চলচ্চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এখনো নারীদের যথেষ্ট আস্থা দেওয়া হয় না। তিনি বলেছিলেন, ‘হাজার বছরের সংস্কৃতি পাঁচ বছরে বদলায় না। পরিবর্তন আসবে, তবে সময় লাগবে।’
‘পার্সেপোলিস’-এর সাফল্যের পর তিনি থেমে থাকেননি। ২০১১ সালে নির্মাণ করেন ‘চিকেন উইথ প্লামস’। চলচ্চিত্রটি এক সংগীতশিল্পীর জীবন নিয়ে, যে নিজের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র হারানোর পর বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে। ২০১৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘রেডিও–অ্যাকটিভ’। বিজ্ঞানী মেরি কুরির জীবনের ওপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন রোজামুন্ড পাইক।সাতরাপির কাছে মেরি কুরি শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সামাজিক বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া নারীর প্রতীক।
চলচ্চিত্রের বাইরে সাতরাপি ছিলেন একজন সক্রিয় মানবাধিকারকর্মী। চলচ্চিত্রের বাইরে সাতরাপি ছিলেন একজন সক্রিয় মানবাধিকারকর্মী। ইরানে নারীদের ওপর নিপীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট এবং রাজনৈতিক বন্দীদের বিষয়ে তিনি নিয়মিত সোচ্চার ছিলেন। ২০২৫ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘লিজিওন দ’অনর’ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। কারণ হিসেবে তিনি ফ্রান্সের ইরান-নীতির সমালোচনা করেন।
সাতরাপির জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাময়। তাঁর স্বামী ম্যাথিয়াস রিপা ছিলেন প্রযোজক, অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকার। দুজনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। ২০২৫ সালের এপ্রিলে রিপার মৃত্যু সাতরাপিকে ভেঙে দেয়। ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, স্বামীর মৃত্যু তিনি কখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে