বাংলাদেশ

প্রতি একরে লাভ ৭২ হাজার টাকা, মাতামুহুরীর চরে বাড়ছে বাদাম চাষ

April 7, 2026
1 month ago
By SAJ
প্রতি একরে লাভ ৭২ হাজার টাকা, মাতামুহুরীর চরে বাড়ছে বাদাম চাষ

নদীর চরটি একসময় ছিল তামাকের দখলে। তামাক ছাড়া অন্য কিছু চাষ হতো না বললেই চলে। তবে এখন চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। তামাকের বদলে খেতজুড়ে চাষ হচ্ছে শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল, বিশেষ করে বাদাম। ভালো ফলন ও লাভ বেশি হওয়ায় চাষিরাও এতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কক্সবাজারের চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীর চরে দেখা যায় এ দৃশ্য।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, চকরিয়ায় বাদাম চাষ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি মৌসুমে ৪৬২ একর জমিতে বাদামের চাষ হয়েছে। এর আগের দুই অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৪৫০ ও ৪২৫ একর। এর মধ্যে অন্তত ৩৫০ একর জমি মাতামুহুরী নদীর চর এলাকায়। হাজিয়ানার চর, বাটাখালী, আমাইন্ন্যার চর, ঘাইট্টার চর, মাঝের ফাঁড়ি, প্রপার কাকারা, মিনিবাজার, সুরাজপুর চরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন বাদামের চাষ হচ্ছে।

সম্প্রতি সুরাজপুর চরে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ বাদাম তুলছেন, কেউ বাছাই করছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরে বাজারজাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের একজন আলী আহমদ। তিনি সাড়ে ছয় একর জমিতে বাদাম চাষ করেছেন।

জানতে চাইলে আলী আহমদ বলেন, প্রতি একরে বাদাম চাষ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। একরে বিক্রি করে পাবেন প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি একরে লাভ হবে প্রায় সাড়ে ৭২ হাজার টাকা, অর্থাৎ এ মৌসুমে তাঁর লাভ থাকবে প্রায় ৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

একই কথা বলেন চরের আরেক তরুণ চাষি খোরশেদ আলম। তিনি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। ২৫ শতক জমিতে ১৬ হাজার টাকা খরচ করে বাদাম চাষ করে তিনি পেয়েছেন ২৬ হাজার ৪০০ টাকা। আগামী মৌসুমে চাষের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

চাষিরা জানান, মাঠপর্যায়ে প্রতি কেজি বাদাম বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকায়। পাইকারেরা একর বা কেজি—দুভাবেই কিনে থাকেন। প্রতি একরের বাদাম বিক্রি হয় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে। বাজারে বর্তমানে খুচরায় ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর বীজ হিসেবে ব্যবহৃত বাদাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়।

তবে তামাক চাষের প্রভাব নিয়ে এখনো উদ্বিগ্ন চাষিরা। তাঁদের অভিযোগ, তামাকখেতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের প্রভাবে আশপাশের জমির ফলন কমে যাচ্ছে। আগে একটি গাছে যেখানে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত ফলন হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১০০ গ্রামে।

বাদামচাষি খানে আলম বলেন, আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত বীজ বপন করা হয়, আর ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে ফসল তোলা। প্রায় ১০০ দিনের মধ্যেই বাদামের ফলন পাওয়া যায়।

তামাক থেকে বাদামে ঝুঁকে পড়ার পেছনে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বড় কারণ। সুরাজপুর চরের বাসিন্দা কানিজ ফাতেমা বলেন, তামাক চাষ করতে গিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগ দেখা দেয়। পরে তাঁরা তামাক ছেড়ে বাদাম চাষ শুরু করেন। এখন আয়ও ভালো, আবার স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমেছে।

আরেক চাষি জাহাঙ্গীর আলমের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। তিনি একসময় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে আট বছর ধরে বাদাম চাষে এখন তিনি সচ্ছল। এ মৌসুমে পাঁচ একর জমিতে চাষ করে ইতিমধ্যে চার লাখ টাকার বাদাম বিক্রি করেছেন। আরও কয়েক লাখ টাকার ফসল তাঁর মাঠে রয়েছে।

বাদামের পাইকার মোহাম্মদ রফিক বলেন, ভরা মৌসুমে দাম কিছুটা কমলেও বাদামে সাধারণত লোকসান হয় না। ২০ থেকে ২৫ দিন আগে যেখানে প্রতি একরে দাম ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, এখন তা কমে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় নেমেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী বলেন, বর্ষায় মাতামুহুরী নদীর উজান থেকে নেমে আসা পলিতে চরাঞ্চলের মাটি উর্বর হয়ে ওঠে। এ কারণে সেখানে ভালো ফলন হয়। একসময় মাত্র ৩০ একর জমিতে বাদাম চাষ হলেও এখন তা বেড়ে ৩৫০ একরে পৌঁছেছে। লাভজনক হওয়ায় তামাকচাষিরাও ধীরে ধীরে বাদাম চাষে ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাষিদের উৎসাহিত করছে।